দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করছে ক্যাপাসিটি চার্জ। সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশি উৎস থেকে বিদ্যুৎ কিনে বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে সরবরাহ করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু এই পুরো ব্যবস্থায় উৎপাদন না হলেও কেন্দ্রগুলোর জন্য নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে সংস্থাটিকে।
ভর্তুকি ছাড়া প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পাইকারি সরবরাহে ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৩ টাকা ৯ পয়সা। এর মধ্যে শুধু ক্যাপাসিটি চার্জই দিতে হচ্ছে প্রতি ইউনিটে ৫ টাকা ১২ পয়সা। অর্থাৎ পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুৎ ব্যয়ের প্রায় ৪০ শতাংশই এই খাতে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে জমা দেওয়া প্রস্তাব এবং কমিশনের কারিগরি কমিটির তথ্য অনুযায়ী এই হিসাব পাওয়া গেছে।
ক্যাপাসিটি চার্জ চুক্তির নিয়ম অনুযায়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন করুক বা না করুক, নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সরকারকে পরিশোধ করতে হয়। মূলত কেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনার খরচ নিশ্চিত করতেই এই অর্থ দেওয়া হয়।
চলতি অর্থবছরে সরকারি, বেসরকারি ও আমদানি মিলিয়ে মোট ১ লাখ ৩ হাজার ৪৭৬ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। এই বিদ্যুৎ কেনায় ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ব্যয় হবে প্রায় ৪৮ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে এই ব্যয় বেড়ে ৫২ হাজার ৬০৮ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
২০১১ সালের পর বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় একের পর এক বেসরকারি ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত বাড়লেও সমান হারে ব্যবহার বাড়েনি। ফলে বহু কেন্দ্র বসিয়ে রেখেই নিয়মিত অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে।
২০১১–১২ অর্থবছরে ইউনিটপ্রতি ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল গড়ে ২ টাকা ৩৫ পয়সা। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ৫ টাকা ২৪ পয়সায় দাঁড়ায়। ১৪ বছরে এই ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। যদিও চলতি বছরে কিছুটা কমার পূর্বাভাস থাকলেও আগামী অর্থবছরে আবার বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত সক্ষমতা ব্যবহার না হওয়াই এই ব্যয় বৃদ্ধির মূল কারণ। অনেক কেন্দ্র বছরের পর বছর উৎপাদন ছাড়াই অর্থ পাচ্ছে। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে বিদ্যুৎ সক্ষমতার প্রায় ৬০ শতাংশই ব্যবহার হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ম তামিম বলেন, গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো জ্বালানি সংকটে পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। ফলে বিপুল অর্থ অব্যবহৃত সক্ষমতার জন্য ব্যয় হচ্ছে। তিনি মনে করেন, পুরোনো ও অকার্যকর কেন্দ্র বন্ধ করা এবং জ্বালানি নিশ্চিত করে কার্যকর কেন্দ্রগুলো চালু রাখা জরুরি। নইলে ক্যাপাসিটি চার্জ আরও বাড়বে।
সম্প্রতি পাইকারি ও খুচরা বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়েছে। পাইকারি দাম ইউনিটপ্রতি গড়ে ৭ টাকা থেকে ৮ টাকা ৩৮ পয়সা করা হয়েছে। এতে প্রতি ইউনিটে বাড়তি ১ টাকা ৩৯ পয়সা যোগ হয়েছে। এরপরও ভর্তুকি ছাড়া প্রকৃত ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ১৩ টাকা ৯ পয়সা। দাম বাড়ানোর ফলে বিপিডিবির অতিরিক্ত আয় হতে পারে প্রায় ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা। তবে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে সরকারকে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হতে পারে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯–১০ থেকে ২০২৩–২৪ অর্থবছর পর্যন্ত বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা। ২০২৪–২৫ অর্থবছর যুক্ত করলে এই অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৭৮ হাজার ৮২৯ কোটি টাকায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশই ব্যবহৃত হয়নি। কিছু কেন্দ্র মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ উৎপাদন করেছে। চুক্তির সময় ৮০ শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহারের শর্ত থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি।
বিদ্যুৎ খাতে সরকারি ও বেসরকারি কেন্দ্রের মধ্যে ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অনেক সরকারি কেন্দ্র জ্বালানির অভাবে বসিয়ে রাখা হলেও বেসরকারি ও আমদানি নির্ভর কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনা অব্যাহত আছে। চলতি অর্থবছরে বেসরকারি ও ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৯ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা। এর বাইরে বিদেশি উৎস থেকেও বড় অঙ্কের ব্যয় রয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতে ক্রমবর্ধমান ভর্তুকি সরকারকে চাপের মুখে ফেলেছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়। চলতি বছরে তা কমানোর লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে তা আবার বেড়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে। বিদ্যুৎ মূল্য নির্ধারণ শুনানিতে ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে সমালোচনা হলেও পরবর্তীতে পাইকারি দাম ১৯ শতাংশের বেশি বাড়ানো হয়। এ পরিস্থিতিতে বিপিডিবি এখন ব্যয় কমাতে বিভিন্ন কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনা ও পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
বিপিডিবির চেয়ারম্যান বলেন, সরকারি কেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ ইতোমধ্যে পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে কমানো হয়েছে। বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং যৌথ উদ্যোগের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মুনাফা কাঠামো নিয়েও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। সংস্থাটি ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

