ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানো এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গতি ফেরাতে আগামী বাজেটে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের ঘোষণা আসছে। নতুন এই উদ্যোগে লাইসেন্স, অনুমোদন ও করসেবা প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করার পাশাপাশি প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন কাঠামোর আওতায় কোনো প্রতিষ্ঠান নতুন লাইসেন্স বা ব্যবসা সম্প্রসারণের আবেদন করলে সাত দিনের মধ্যে সাময়িক বা অন্তর্বর্তীকালীন অনুমতি পাবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত অনুমোদন না মিললে সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত হিসেবে গণ্য করা হবে—যা প্রচলিত প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এছাড়া ব্যবসায়ীদের জন্য বারবার লাইসেন্স নবায়নের ঝামেলা কমাতে সব ধরনের অনুমতি ও লাইসেন্সের মেয়াদ পাঁচ বছর করার পরিকল্পনাও রয়েছে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বাজেট বক্তৃতায় “নিয়ন্ত্রণ শিথিলের মাধ্যমে ব্যবসা সহজীকরণ” শিরোনামে একটি বিশেষ অধ্যায় যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে প্রশাসনিক সংস্কার, প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং কর সুবিধার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অযথা বিলম্ব কমানো, অতিরিক্ত কাগজপত্রের পুনরাবৃত্তি দূর করা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়াকে দ্রুত করার লক্ষ্যেই এই সংস্কার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও এর মাঠ পর্যায়ের দপ্তরগুলোতে পূর্ণাঙ্গ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে কর প্রশাসনের আধুনিকায়নও এই বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে যাচ্ছে। নতুন পরিকল্পনায় অনলাইনে করপোরেট রিটার্ন জমা, বছরজুড়ে রিটার্ন দাখিলের সুযোগ এবং সময়মতো রিটার্ন দিলে প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। অন্যদিকে দেরিতে রিটার্ন জমা দিলে অতিরিক্ত কর দিতে হবে। কর রেয়াত ও কর ফেরত সরাসরি করদাতার ব্যাংক হিসাবে জমা হবে। এতে প্রশাসনিক জটিলতা ও হয়রানি কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ই-রিটার্ন সুবিধা আরও সহজ করতে একটি মোবাইল অ্যাপ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। ডিজিটাল কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়াতে এবং করদাতাদের সেবা নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত অনলাইন প্ল্যাটফর্মও চালু করা হবে।
নতুন ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীরা একাধিক সংস্থার অনুমোদনের জন্য আলাদা আলাদা আবেদন না করে একটি মাত্র পয়েন্ট থেকে সব আবেদন করতে পারবেন। একে ওয়ান-স্টপ বা একক প্রবেশদ্বার ব্যবস্থা বলা হচ্ছে। সব সংস্থাকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অনুমোদন দিতে বাধ্য করা হবে। একই সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কিছু স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা কমানো হতে পারে বলে জানা গেছে।
এছাড়া সব লাইসেন্স ও সনদ অনলাইনে পাওয়া যাবে এবং একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যার নাম “বাংলাবিজ”। জাতীয় একক উইন্ডো পুরোপুরি চালু করা হবে। এর মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর আবাসন সনদ ইস্যু করা হবে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কর সুবিধা গ্রহণকে সহজ করবে।
ডিজিটালাইজেশনের অংশ হিসেবে অনলাইনে করপোরেট রিটার্ন ফাইলিং বাধ্যতামূলক করা হবে। আগেভাগে রিটার্ন দিলে প্রণোদনা থাকবে এবং দেরিতে জমা দিলে অতিরিক্ত কর দিতে হবে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক মুনাফা বিতরণ শর্ত শিথিল করা হতে পারে, যাতে প্রতিষ্ঠানগুলো মূলধন শক্তিশালী করতে পারে।
ছোট ও মাঝারি ব্যবসার ওপর অডিটের চাপ কমাতে বার্ষিক টার্নওভার সীমা ৫ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ কোটি টাকা করার প্রস্তাবও রয়েছে। কর বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আপিল, ট্রাইব্যুনাল, উচ্চ আদালত এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়াকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
বাজেটে দেরিতে রিটার্ন জমা দিলে নির্দিষ্ট জরিমানা দিয়ে তা গ্রহণের সুযোগ রাখা হতে পারে। অন্যদিকে কর কর্তন না করলে নতুনভাবে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের বিধান আসতে পারে। এছাড়া কিছু ব্যয়ের সীমা বাড়ানো, বৈদেশিক মুদ্রায় সরবরাহকে রপ্তানি হিসেবে গণ্য করা এবং কাস্টমস ও কর ব্যবস্থাকে একীভূত করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ ওশেন গোয়িং শিপওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আজম জে চৌধুরী বলেছেন, অনলাইন কর ব্যবস্থা ও নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের ফলে আটকে থাকা রাজস্ব দ্রুত আদায় হবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। তিনি আরও বলেন, কর ফেরত প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় হলে ব্যবসায়ীরা নিয়মিত কর দিতে উৎসাহিত হবেন। কাস্টমস ও কর তথ্য একীভূত হলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ পরিবেশ আরও শক্তিশালী হবে।

