ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো এবং দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ আরও আকর্ষণীয় করতে একগুচ্ছ কর-সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থার আওতায় অন্তত ১৯টি খাতে আমদানি পর্যায়ের অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ও স্থানীয় পর্যায়ের উৎসে কর কমানো হতে পারে। পাশাপাশি নতুন, তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্যও বিশেষ কর-সুবিধা দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আসন্ন বাজেটে ব্যবসা ও বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যেই এসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে মোবাইল ফোন ও ইলেকট্রনিকস শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে উল্লেখযোগ্য কর প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে।
এনবিআরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কর ছাড়ের পাশাপাশি ব্যবসার পথে থাকা বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আইনি প্রতিবন্ধকতাও দূর করার চেষ্টা চলছে। এতে বিনিয়োগ বাড়বে এবং ব্যবসা পরিচালনা সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রপ্তানি খাতকে উৎসাহিত করতে নগদ প্রণোদনার ওপর উৎসে কর বর্তমান ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হতে পারে। কম্পিউটার যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদনে ব্যবহৃত ২২ ধরনের উপকরণের ওপর অগ্রিম আয়কর ১ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
দেশীয়ভাবে উৎপাদিত তেলবীজ থেকে ভোজ্য তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১০ বছরের কর অবকাশ সুবিধা দেওয়া হতে পারে। রিসাইক্লিং শিল্পে কাঁচামাল সরবরাহের ওপর কর ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাবও রয়েছে।
স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার ব্যবসাকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনতে বড় ধরনের ছাড়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ খাতে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর কমিয়ে মাত্র ০.৫ শতাংশ করা হতে পারে।
জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও চার্জিং স্টেশন স্থাপনে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির আমদানিতে বর্তমানে থাকা ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর পুরোপুরি প্রত্যাহারের চিন্তা করছে সরকার। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন ফি সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা থেকে অর্ধেকে নামিয়ে আনার প্রস্তাবও বিবেচনায় রয়েছে।
শোধনাগারে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎসে কর ১.৫ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে নামতে পারে। মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবার ক্ষেত্রে ১২ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ এবং প্যাকেজিং উপকরণের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশে কমতে পারে করের হার।
পরিবহন, পণ্য পরিবহন এবং যানবাহন ভাড়া সেবার ওপর উৎসে করও ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বর্তমানে ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর রয়েছে। এটি ৪ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা ভাবা হচ্ছে। স্থানীয় সরবরাহ পর্যায়েও একই হারে কর কমানো হতে পারে। অনাবাসীদের সরবরাহ করা যন্ত্রপাতির ওপর উৎসে কর ১৫ শতাংশ থেকে অর্ধেকে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। একইভাবে অনাবাসীদের দেওয়া বিমা প্রিমিয়ামের ওপর করও কমতে পারে।
বিদেশি উৎস থেকে নেওয়া ঋণের সুদ পরিশোধের ক্ষেত্রে উৎসে কর ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে বিশেষ আদেশের মাধ্যমে এ করের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হচ্ছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও বড় ধরনের কর-সুবিধা আসতে পারে। এ খাতে বিনিয়োগকারীদের আয় ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সম্পূর্ণ করমুক্ত রাখার প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের জন্যও কর রেয়াতের সুযোগ রাখা হতে পারে।
করদাতাদের সুবিধার্থে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে রিটার্ন দাখিলের সুযোগ চালু হতে পারে।
একই সঙ্গে সারা বছর রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে প্রদেয় করের ১০ শতাংশ অথবা ৫ হাজার টাকার মধ্যে যেটি কম, সেই পরিমাণ কর রেয়াত পাওয়া যেতে পারে।
বর্তমানে উৎসে কর কর্তনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো প্রতিষ্ঠান কর কেটে রাখতে ব্যর্থ হলে পুরো ব্যয় অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। নতুন প্রস্তাবে এ বিধান অনেকটাই শিথিল করা হচ্ছে। অনুমোদিত ব্যয়ের সীমাও বাড়ানো হতে পারে, যা ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমাতে সহায়ক হবে।
রাজস্বসংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়াও সহজ করা হতে পারে। এছাড়া অতিরিক্ত কাটা কর ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা প্রথমবারের মতো চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ন্যূনতম কর ব্যবস্থাও তুলে দেওয়া হতে পারে। ফলে অতিরিক্ত কর্তিত করের অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে ব্যবসার কার্যকর করহার কমে আসবে। তাদের মতে, অতীতে করপোরেট করহার কমানো হলেও বিভিন্ন শর্ত ও জটিলতার কারণে ব্যবসায়ীরা প্রত্যাশিত সুবিধা পাননি।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, অগ্রিম আয়কর ও উৎসে কর কমানোর উদ্যোগগুলো বাজেটে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়ে মাঠপর্যায়ে কার্যকর হলে তা ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য বড় সহায়ক হবে। তবে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নের সামঞ্জস্য না থাকলে প্রত্যাশিত ফল নাও আসতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, ব্যবসা সহজীকরণ ও কর ছাড়ের দিক থেকে এবারের বাজেট হতে পারে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যবসাবান্ধব ও বিনিয়োগবান্ধব বাজেট।
ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট নির্মাতাদের সম্পূর্ণ করমুক্ত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বার্ষিক টার্নওভার ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত হতে পারে। নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে এই সীমা ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে।
স্টার্টআপ, উদ্ভাবনভিত্তিক উদ্যোগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার জন্য ৯ বছরের কর অবকাশ সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য অবচয় হিসাবের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হতে পারে, যার ফলে তাদের করের বোঝা আরও কমবে।

