আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। এই বিশাল ব্যয় পরিকল্পনার বিপরীতে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি দেখা দেবে বলে হিসাব করা হয়েছে। সেই ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ ব্যাংকঋণকে প্রধান ভরসা হিসেবে বেছে নিয়েছে সরকার।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাজেট ঘাটতির প্রায় ৪৬ শতাংশ অর্থাৎ ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে এবং বাকি ৫৪ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে সংগ্রহ করা হবে।
আগামী বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করবেন। সরকারের লক্ষ্য, বাজেট ঘাটতি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩.৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সাধারণত উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জিডিপির ৫ শতাংশের নিচে বাজেট ঘাটতি রাখার পরামর্শ দিয়ে থাকে।
আগামী অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। এটি চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৮৪ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে ঘোষিত সর্বশেষ বাজেটে প্রাপ্ত বৈদেশিক সহায়তার চেয়েও ৬৬ শতাংশ বেশি।
চলতি অর্থবছরের শুরুতে বিদেশি উৎস থেকে ১ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়নি। প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং প্রত্যাশিত বাজেট সহায়তা না পাওয়ায় সংশোধিত বাজেটে লক্ষ্য কমিয়ে ৬৩ হাজার কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু মে মাসের শেষ পর্যন্ত বৈদেশিক অর্থায়ন পাওয়া গেছে মাত্র ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তাদের মতে, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো আবার গতি পেতে পারে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্থবির হয়ে পড়া বিদেশি ঋণনির্ভর বড় প্রকল্পগুলোর কাজ পুনরায় শুরু হলে অর্থছাড়ও বাড়বে।
কর্মকর্তারা জানান, বর্তমান সরকার পূর্ণ একটি অর্থবছর হাতে পাচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে। নতুন এডিপিতেও কয়েকটি বড় প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় আগামী বছরে বৈদেশিক ঋণ ছাড়ের পরিমাণ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কতটা বাস্তবসম্মত?
বিশ্লেষকদের মতে, বৈদেশিক ঋণ সংগ্রহের লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, চলতি অর্থবছরে বিদেশি ঋণ সংগ্রহের ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা থেকে বড় ধরনের বিচ্যুতি দেখা গেছে।
তার মতে, প্রকল্প অনুমোদনে বিলম্ব, ক্রয় প্রক্রিয়ার জটিলতা, প্রশাসনিক ধীরগতি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের শর্ত পূরণে ব্যর্থতা বৈদেশিক অর্থায়ন কমে যাওয়ার প্রধান কারণ। পাশাপাশি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক উন্নয়ন সহযোগী অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তিনি মনে করেন, ভবিষ্যতে বিদেশি ঋণ বাড়াতে হলে উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা পুনর্গঠন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে।
ইআরডি সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প ঋণ এবং ১ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা নিশ্চিত হয়েছে। সব মিলিয়ে ২ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বৈদেশিক সহায়তার নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। তবে সংশোধিত বাজেটে নির্ধারিত ৬৩ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এই অঙ্ক এখনও অনেক কম।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বৈদেশিক উৎস থেকে মোট ৯০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ঋণ পাওয়া গিয়েছিল। এর আগের অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ৭৪ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা।
কর্মকর্তারা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নেওয়া অনেক বিদেশি ঋণনির্ভর প্রকল্প অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে স্থগিত হয়ে যায়। ফলে প্রকল্প ঋণের অর্থছাড় কমে যায়। একই সঙ্গে আইএমএফের শর্ত পূরণ না হওয়ায় চলতি অর্থবছরে দুই কিস্তিতে ১ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার পাওয়া যায়নি। বিশ্বব্যাংক থেকেও এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম সহায়তা এসেছে।
বর্তমানে সরকার ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা চালালেও প্রত্যাশিত সাড়া মিলছে না। এ অবস্থায় বিভিন্ন চলমান প্রকল্পের অনাবশ্যক ঋণ পুনর্বিন্যাস করে জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক থেকে ১ বিলিয়ন ডলার, জাপান থেকে ৩১৫ মিলিয়ন ডলার, এআইআইবি থেকে ২৫০ মিলিয়ন ডলার এবং ওপেক ফান্ড থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তার আশ্বাস পাওয়া গেছে। পাশাপাশি প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যার বড় অংশ আগামী অর্থবছরে ছাড় হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইআরডি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার পরিবর্তনের পর অনেক প্রকল্প পরিচালক দায়িত্বে ছিলেন না বা তাদের পরিবর্তন করা হয়। নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও প্রকল্প পুনর্বিন্যাসে সময় লেগেছে। এছাড়া নতুন সরকারি ক্রয়নীতির কারণে অনেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগ দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বিলম্ব করেছে। ফলে বৈদেশিক অর্থায়নের বহু প্রকল্পে বরাদ্দ অনুযায়ী ব্যয় করা সম্ভব হয়নি এবং উন্নয়ন সহযোগীরাও অর্থ ছাড়ে অনাগ্রহ দেখিয়েছে।
আইএমইডির তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে বৈদেশিক ঋণের ব্যবহার হয়েছে ৩২ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ৩৫ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা এবং তার আগের বছরে ছিল ৪৮ হাজার ৪৬৮ কোটি টাকা।
ব্যাংক থেকে ঋণ বাড়ানোর পরিকল্পনা:
বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকেও বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্যাংকখাত থেকে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হতে পারে।
যদিও অভ্যন্তরীণ ঋণে খেলাপির ঝুঁকি নেই, তবে এর সুদের হার তুলনামূলক বেশি। ফলে সরকারের সুদ ব্যয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
ফাহমিদা খাতুনের মতে, বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বর্তমানে ঋণের চাহিদা কিছুটা কম থাকলেও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অনুকূল পরিবেশের অপেক্ষায় রয়েছে। পরিস্থিতি উন্নত হলে ঋণের চাহিদা দ্রুত বাড়তে পারে।
চলতি অর্থবছরে ব্যাংকখাত থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে রাজস্ব ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় সংশোধিত বাজেটে এই লক্ষ্য আরও ১৪ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে।
অন্যদিকে উচ্চ সুদের কারণে সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। চলতি অর্থবছরে এখাত থেকে ২১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১৯ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে।

