দেশে বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের গতি বাড়াতে কর ব্যবস্থায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পথে হাঁটছে সরকার। ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আগামী পাঁচ বছর করপোরেট করের হার অপরিবর্তিত রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে উৎসে কাটা করকে ন্যূনতম করের পরিবর্তে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করা এবং রপ্তানি প্রণোদনার ওপর করের বোঝা কমানোর উদ্যোগও থাকছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এসব প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
এনবিআরের কর্মকর্তারা জানান, বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা দিতে বর্তমান করপোরেট করহার অপরিবর্তিত রাখা হবে। তবে যেসব খাতে করের হার তুলনামূলক বেশি, সেসব ক্ষেত্রে করের আওতা বাড়িয়ে ধীরে ধীরে করহার কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্যবসার তারল্য বাড়াতে অনুমোদনযোগ্য ব্যয়ের পরিধি সম্প্রসারণ এবং উৎসে কর কর্তনের কারণে ব্যয় অগ্রাহ্য করার বিদ্যমান বিধান বাতিলের প্রস্তাব করা হচ্ছে। পাশাপাশি অডিটের জন্য মামলা নির্বাচন ও উৎসে কর যাচাই প্রক্রিয়া পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় ও স্বচ্ছ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের করহারের ব্যবধান আগের মতোই ৫ শতাংশ থাকবে। সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করা কোম্পানির করহার হবে সাড়ে ২২ শতাংশ। তবে সব আয় ও লেনদেন ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হলে করহার কমে ২০ শতাংশে নামবে।
অন্যদিকে অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার নির্ধারণ করা হয়েছে সাড়ে ২৭ শতাংশ। এসব প্রতিষ্ঠান সব লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন করলে করহার হবে ২৫ শতাংশ। ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলে করহার সাড়ে ৩৭ শতাংশ এবং অ-তালিকাভুক্ত থাকলে ৪০ শতাংশ বহাল থাকবে।
তামাকজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ করহার অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। এর সঙ্গে অতিরিক্ত আড়াই শতাংশ সারচার্জও কার্যকর থাকবে। মোবাইল অপারেটরদের জন্যও ৪৫ শতাংশ করহার বহাল রাখা হচ্ছে। তবে কোনো মোবাইল কোম্পানি পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার শেয়ারবাজারে ছাড়লে তাদের করহার হবে ৪০ শতাংশ।
এ ছাড়া মোবাইল অপারেটরদের আরও বেশি শেয়ার বাজারে আনতে কর রেয়াতের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি যদি প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের মাধ্যমে কমপক্ষে ২০ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে, তাহলে সংশ্লিষ্ট বছরের আয়করের ওপর ১০ শতাংশ হারে রেয়াত পাবে।
উৎপাদন ব্যয় কমাতে এবং ব্যবসার নগদ প্রবাহ বাড়াতে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রে উৎসে কর ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে রপ্তানি আয়ের নগদ প্রণোদনার ওপর উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ এবং রিফাইনারি থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে দেড় শতাংশ থেকে ১ শতাংশে নামানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কর ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসছে ন্যূনতম করের ক্ষেত্রে। বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান কম আয় বা করযোগ্য আয় না থাকলেও উৎসে কাটা করকে ন্যূনতম কর হিসেবে পরিশোধ করতে বাধ্য হয়। নতুন প্রস্তাবে আন্তর্জাতিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উৎসে কাটা করকে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করা হবে। ফলে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করলে তা ফেরত পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এ বিষয়ে তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠনের সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, রপ্তানি প্রণোদনা মূলত সহায়তা হিসেবে দেওয়া হয়। তাই এর ওপর উৎসে কর থাকা উচিত নয়। তিনি উৎসে করকে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করার উদ্যোগকে স্বাভাবিক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করলেও কর নির্ধারণ প্রক্রিয়া যথাযথ হওয়া প্রয়োজন বলে মত দেন।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের ব্যয় কমানোর লক্ষ্যেও কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ভোজ্যতেল, চাল, ধান, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ ও চিনিসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় ও কৃষিপণ্যের ওপর উৎসে করের হার সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এনবিআরের ধারণা, এতে বাজারে সরবরাহ বাড়বে এবং পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে।
স্বাস্থ্যসেবা খাতে কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানির ওপর বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এর ফলে প্রতি ডায়ালাইসিসে প্রায় ৬০০ টাকা পর্যন্ত খরচ কমতে পারে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহৃত ১৫ ধরনের আমদানিকৃত পণ্যের অগ্রিম আয়কর ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হচ্ছে। স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার সরবরাহে উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ হবে। পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থাকে উৎসাহ দিতে বৈদ্যুতিক চার্জিং স্টেশন, বৈদ্যুতিক বাস ও ট্রাক আমদানিতে উৎসে কর প্রত্যাহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রযুক্তি খাতেও কর সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। কম্পিউটার প্রিন্টার, মডেম ও ফ্ল্যাশ মেমোরি আমদানিতে অগ্রিম কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা হবে। স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ২২ ধরনের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রেও অগ্রিম কর কমিয়ে ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হচ্ছে।
ভোজ্যতেলের সরবরাহ বাড়াতে দেশীয় তৈলবীজ ব্যবহার করে ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে ১০ বছরের কর অব্যাহতি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এনবিআর মনে করছে, এতে কৃষি খাতে বিনিয়োগ বাড়বে এবং আমদানিনির্ভরতা কমবে।
রাজস্ব আয় বাড়াতে করহার না বাড়িয়ে করের ভিত্তি সম্প্রসারণের কৌশলও নেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহের ওপর শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ অগ্রিম কর সংগ্রহের প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। অন্যদিকে তরুণ, নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে ফ্রিল্যান্সিং এবং কনটেন্ট নির্মাণ থেকে অর্জিত সব আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি স্টার্টআপ ও প্রযুক্তি খাতের জন্য শূন্য টার্নওভার কর নির্ধারণের প্রস্তাবও রয়েছে।
এসএমই খাতে পুরুষ উদ্যোক্তাদের বার্ষিক ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত এবং নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

