দেশের একজন দিনমজুর আয়কর না দিলেও বাজার থেকে চিনি কিনতে গেলে, একজন রিকশাচালক মোবাইলে রিচার্জ করলে কিংবা একজন কৃষক রান্নার গ্যাসের বিল পরিশোধ করলে রাষ্ট্রের কোষাগারে অর্থ জমা হয়। কারণ এসব ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), যা বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে সরকারের মোট আয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।
এই রাজস্ব লক্ষ্যের সবচেয়ে বড় একক উৎস হিসেবে আবারও ভ্যাটের ওপর নির্ভরতা রাখা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে ভ্যাট থেকে ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা এনবিআরের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৩৭ শতাংশ।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ভয়েস ফর রিফর্মের তথ্য অনুযায়ী, উন্নত দেশগুলো সাধারণত আয়কর, সম্পদ কর ও উত্তরাধিকার করের মতো প্রত্যক্ষ করের ওপর নির্ভরশীল। তবে বাংলাদেশে পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানে ভ্যাট, শুল্ক এবং উৎসে করের মতো পরোক্ষ কর থেকেই রাজস্বের বড় অংশ আসে। মোট রাজস্বের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে এসব উৎস থেকে।
ভ্যাটের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটি আয়ের ওপর নয়, ব্যয়ের ওপর আরোপিত হয়। ফলে একজন ব্যক্তি কত আয় করেন, তা বিবেচ্য নয়; পণ্য বা সেবা কিনলেই তাকে ভ্যাট দিতে হয়। এ কারণে উচ্চ আয়ের ব্যক্তি ও নিম্ন আয়ের মানুষ একই হারে ভ্যাট পরিশোধ করেন, যদিও তাদের আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, রাজস্ব প্রশাসন সাধারণত এমন খাতেই বেশি গুরুত্ব দেয় যেখানে কর আদায় তুলনামূলক সহজ ও নিশ্চিত। কিন্তু করজাল সম্প্রসারণ, প্রকৃত আয়কর আদায় এবং কর ফাঁকি রোধে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখা যায় না। তিনি মনে করেন, নিয়মিত করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়িয়ে নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্ত করা এবং কর ফাঁকি কমানোর উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন।
পরিসংখ্যানগতভাবে আয়কর ও ভ্যাটের অবদান কাছাকাছি মনে হলেও বাস্তবে এদের প্রভাব ভিন্ন। আয়কর কেবল নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ পরিশোধ করেন। কিন্তু ভ্যাট দিতে হয় সবাইকে। একজন ধনী ব্যক্তি বিলাসবহুল গাড়ি কিনলে যেমন ভ্যাট দেন, তেমনি একজন শ্রমিকও মোবাইল ব্যবহার, গ্যাস বিল পরিশোধ কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সময় একই ধরনের করের আওতায় পড়েন।
এ কারণেই অর্থনীতিবিদেরা বাংলাদেশের করব্যবস্থাকে পরোক্ষ করনির্ভর বলে উল্লেখ করেন। তাঁদের মতে, সহজে রাজস্ব সংগ্রহের সুবিধার কারণে ভ্যাট, উৎসে কর ও আমদানি শুল্কের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। অন্যদিকে আয় গোপন, সম্পদ আড়াল কিংবা কর ফাঁকির সুযোগ নিয়ে অনেক ধনী ব্যক্তি করের বাইরে থেকে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে শত শত কোটি টাকার করসংক্রান্ত মামলা দীর্ঘদিন ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
এনবিআরের তথ্য বলছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মোট রাজস্বের ৬৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ এসেছিল পরোক্ষ কর থেকে। প্রত্যক্ষ করের অবদান ছিল ৩১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। প্রায় এক দশক পরও এই চিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। ভ্যাট এখনো রাজস্ব আহরণের সবচেয়ে বড় অবলম্বন।
বাজেটের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভ্যাটের ওপর নির্ভরতাও বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যের তুলনায় আগামী অর্থবছরে শুধু ভ্যাট থেকেই অতিরিক্ত ৩৮ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে রাজস্ব বৃদ্ধির বড় অংশের চাপ পড়ছে ভোগ ও ব্যয়ের খাতের ওপর।
অক্সফাম বাংলাদেশের সহায়তায় পরিচালিত এক গবেষণায় করব্যবস্থার বৈষম্যের একটি স্পষ্ট চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা যায়, দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী তাদের আয়ের ১২ দশমিক ১ শতাংশ ভ্যাট হিসেবে পরিশোধ করে। বিপরীতে ধনী মানুষের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ আয়ের অনুপাতে দরিদ্ররা ধনীদের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি করের বোঝা বহন করছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ভ্যাটের প্রকৃত চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই গিয়ে পড়ে। ব্যবসায়ীরা প্রাথমিকভাবে কর দিলেও পরে তা পণ্যের মূল্যের সঙ্গে যুক্ত করে আদায় করেন। তাই ভ্যাট বাড়ানোর আগে মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষের সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি কার্যকর করব্যবস্থার মূল নীতি হওয়া উচিত—যার আয় বেশি, তার করের দায়ও বেশি হবে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় ব্যয়ের ওপর করের নির্ভরতা বেশি হওয়ায় নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ তুলনামূলক বেশি চাপের মুখে পড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো প্রয়োজন হলেও এর সহজ সমাধান ভ্যাট বৃদ্ধি নয়। তাঁর মতে, প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, তথ্যভিত্তিক কর ব্যবস্থাপনা এবং কর ফাঁকি কমানোর মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর বড় সুযোগ এখনো রয়েছে। করের হার বাড়ানোর আগে করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ফাঁকির পথ বন্ধ করাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

