বাংলাদেশে জনসংখ্যার কাঠামোতে নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় সামান্য বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০০ জন নারীর বিপরীতে পুরুষ রয়েছে ৯৬ দশমিক ৩৩ জন। অর্থাৎ জনসংখ্যার বড় একটি অংশ এখন নারী।
তৈরি পোশাক, কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোগ, সেবা খাত এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে নারীরা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। কিন্তু ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকানায় তাদের অংশগ্রহণ এখনো খুবই সীমিত।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মাত্র ৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে নারীদের মালিকানা অংশীদারত্ব রয়েছে, যা নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর গড়ের তুলনায় কম। অন্যদিকে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির তথ্যে বলা হয়েছে, দেশে প্রায় ২৮ লাখ নারী-নেতৃত্বাধীন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ রয়েছে, যা মোট এ খাতের প্রায় ২৫ শতাংশ। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৮৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। তবে নিবন্ধিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মাত্র ৭ দশমিক ২ শতাংশ নারী মালিকানাধীন।
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা থাকলেও বাস্তবে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে জামানতের শর্ত। অধিকাংশ নারীর নামে সম্পত্তি না থাকায় ব্যাংকের শর্ত পূরণ করা সম্ভব হয় না। ফলে নীতিগত সুবিধা থাকলেও অনেক নারী উদ্যোক্তা ঋণ থেকে বঞ্চিত হন।
ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রূপালী চৌধুরী বলেন, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা থাকলেও বাস্তবে জামানতের শর্তই সবচেয়ে বড় বাধা। তিনি বলেন, “অধিকাংশ নারীর নামে সম্পত্তি না থাকায় ব্যাংকের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করা সম্ভব হয় না। ফলে নীতিগত সুবিধা থাকলেও অনেক নারী উদ্যোক্তা ঋণ পান না।” তিনি আরও বলেন, শুধু বরাদ্দ রাখলেই হবে না। এমন একটি ব্যবস্থা দরকার যেখানে উদ্যোক্তার ব্যবসার সম্ভাবনা, লেনদেনের ইতিহাস এবং সক্ষমতার ভিত্তিতে অর্থায়ন করা হবে।
তার মতে, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বা নতুন উদ্যোগ অর্থায়নের মতো মডেল অনুসরণ করে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিকল্প অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। প্রযুক্তি, উৎপাদন, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, লজিস্টিকস ও রপ্তানিমুখী খাতে নারীদের উৎসাহিত করার কথাও তিনি বলেন।
বিজিএমইএর সহসভাপতি বিদিয়া অমৃত খান মনে করেন, অনেক অর্থায়ন প্রকল্প এখনো পুরুষ নির্ভর কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তিনি বলেন, একজন নারী যদি স্বামী, ভাই বা অন্য পুরুষ সদস্যের গ্যারান্টির ওপর নির্ভর করে ঋণ পান, তবে সেটি প্রকৃত অর্থে নারী ক্ষমতায়ন নয়।
তিনি আরও বলেন, নারীদের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ, পুরুষ গ্যারান্টার ছাড়াই অর্থায়ন এবং ব্যবসার সম্পদকে জামানত হিসেবে গ্রহণের ব্যবস্থা চালু করতে হবে। তার মতে, ব্যবসার অর্ডার, নগদ প্রবাহ, যন্ত্রপাতি ও সম্ভাবনাকেও মূল্যায়ন করা উচিত। পৈতৃক সম্পত্তি না থাকলে ঋণ না পাওয়ার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীর অবদান দৃশ্যমান হলেও মালিকানার ক্ষেত্রে তারা এখনো প্রান্তিক অবস্থানে আছেন। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নয়নশীল দেশে নারী উদ্যোক্তারা পুরুষদের তুলনায় কম অর্থায়ন পান এবং ঋণের শর্তও তুলনামূলকভাবে কঠিন।
দেশের বাস্তবতায় অনেক নারী উদ্যোক্তার ব্যাংক হিসাব থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি ব্যাংকিং ইতিহাস নেই। আবার সম্পত্তির মালিকানা পুরুষদের হাতে বেশি থাকায় তারা জামানত দেখাতে পারেন না। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরের বাজেটে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন ঋণ, স্বল্প সুদে অর্থায়ন ও বিশেষ কর সুবিধার দাবি উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উদ্যোগ নারী উদ্যোক্তা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, অনেক নারী উদ্যোক্তার জামানত না থাকলেও তাদের ব্যবসা সম্ভাবনাময়। তাই সরকার-সমর্থিত একটি ঋণ ঝুঁকি বণ্টন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যেখানে ঝুঁকির একটি অংশ সরকার বহন করবে। তিনি আরও বলেন, জামানতবিহীন ঋণের সীমা বাড়ানো প্রয়োজন। বর্তমানে এই সীমা ব্যবসার বাস্তব প্রয়োজনের তুলনায় কম। পাশাপাশি স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা বাড়ালে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে। তার মতে, নারী পরিচালিত নতুন প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের কর ছাড়, সহজ ভ্যাট নিবন্ধন এবং কর দাখিলে সহায়তা দেওয়া উচিত।
খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ রাখা জরুরি। সরকারি ক্রয়ের একটি অংশ নারী মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের জন্য সংরক্ষণ করা গেলে তারা বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবেন এবং ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারবেন।
আগামী বাজেটে জামানতবিহীন ঋণ, ঋণ ঝুঁকি বণ্টন ব্যবস্থা, কর সুবিধা, সরকারি ক্রয়ে অগ্রাধিকার, নারী উদ্যোক্তা তহবিল এবং নিরাপদ ব্যবসা পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে। আর সেটিই হতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি।

