এক দশকের বেশি সময় ধরে নানা জটিলতায় আটকে থাকা চট্টগ্রামের আনোয়ারার চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড) প্রকল্প অবশেষে বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। আগামীকাল শুরু হচ্ছে বহুল প্রত্যাশিত এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজ।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, চীনের সহায়তায় গড়ে উঠতে যাওয়া এই অর্থনৈতিক অঞ্চল দেশে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আনতে পারে। পাশাপাশি সৃষ্টি হতে পারে এক লাখের বেশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান।
আগামীকাল সকাল ১০টায় আনোয়ারার প্রকল্প এলাকায় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক সূচনা হবে। অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে।
৮০০ একরে গড়ে উঠবে শিল্পাঞ্চল:
সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) উদ্যোগের আওতায় আনোয়ারায় প্রায় ৮০০ একর জমিতে তৈরি হচ্ছে চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন। প্রকল্পটি চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পভিত্তি সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩১ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর প্রকল্পটির বাস্তবায়ন দেশের শিল্প খাতের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। এতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ার পাশাপাশি চট্টগ্রাম অঞ্চলে শিল্পায়নের গতি আরও বাড়বে।
চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আমিরুল হক বলেন, চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য নির্ধারিত এই অর্থনৈতিক অঞ্চল দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও গভীর করবে। একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি ও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে।
পোশাক খাতে কমবে উৎপাদন ব্যয়:
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতও এই প্রকল্প থেকে বড় ধরনের সুবিধা পেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক এস এম আবু তৈয়ব বলেন, বর্তমানে পোশাক শিল্পের প্রয়োজনীয় কাপড়, অ্যাকসেসরিজসহ বিভিন্ন কাঁচামালের বড় অংশ চীন থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে পরিবহন সময় ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়।
তার মতে, চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি চট্টগ্রামের এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে এসব কাঁচামাল উৎপাদন করে সরবরাহ করতে পারে, তাহলে পোশাক শিল্পের উৎপাদন খরচ কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিইআইজেডে উন্নত টেক্সটাইল, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি ও অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এখানে শুধু চীনা বিনিয়োগকারী নয়, দেশীয় ও অন্যান্য দেশের বিনিয়োগকারীরাও যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
বেজার নির্বাহী সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মেজর জেনারেল (অব.) মো. নজরুল ইসলাম জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়কাল পাঁচ বছর নির্ধারণ করা হলেও প্রথম তিন বছরের মধ্যেই অন্তত ৬০ শতাংশ শিল্প প্লট কারখানা স্থাপনের উপযোগী করার লক্ষ্য রয়েছে।
দীর্ঘদিন স্থবির থাকা প্রকল্পটি সাম্প্রতিক সময়ে নতুন গতি পায়। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের পর বিনিয়োগ সহযোগিতা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কয়েকটি চুক্তি হয়। গত ২৫ জুন অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের জন্য বেজা ও চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (সিআরবিসি) মধ্যে ডেভেলপার চুক্তি বিনিময় হয়।
চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জানান, ইতোমধ্যে ৩০টির বেশি চীনা কোম্পানি এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। তিনি বলেন, বেইজিং ও ডালিয়ানে চীনা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকের পর বাংলাদেশে বিনিয়োগ নিয়ে আগ্রহ আরও বেড়েছে।
৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকার অবকাঠামো উন্নয়ন:
প্রকল্পটির সহায়ক অবকাঠামো উন্নয়নে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এর মধ্যে চীন সরকার রেয়াতি অর্থায়নের মাধ্যমে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা দেবে। বাকি অর্থ দেবে বাংলাদেশ সরকার।
এই অর্থ দিয়ে নির্মাণ করা হবে জেটি সংযোগ সড়ক, চার লেনের রাস্তা, সেতু, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার, বহুমুখী জেটি, গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সাবস্টেশন, সঞ্চালন লাইন, জলাধার ও সীমানাপ্রাচীর। প্রকল্প এলাকায় প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম বন্দর ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় এই অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিবহন ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি সুবিধা পাবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্দর ও যোগাযোগ সুবিধার কারণে রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ ও চীন ২০১৪ সালে এই প্রকল্প নিয়ে সমঝোতা স্মারক সই করে। ২০১৬ সালে জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হয়। তবে ডেভেলপার নির্বাচন, অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রকল্পটি দীর্ঘদিন এগোয়নি।
শুরুতে ডেভেলপার হিসেবে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির (সিএইচইসি) নাম আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। পরে ২০২২ সালে চীন সরকার প্রকল্প উন্নয়নের দায়িত্ব দেয় চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে (সিআরবিসি)। এরপর থেকেই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে গতি পেতে শুরু করে।

