একটি জন্মদিন বা পারিবারিক উৎসব সামনে। পরিকল্পনা অনেক। নতুন পোশাক কেনা, বন্ধু বা আত্মীয়দের ভালো কোনো রেস্তোরাঁয় আপ্যায়ন করা, কিংবা নিজের জন্য কোনো গ্যাজেট কেনা—সব মিলিয়ে খরচ দাঁড়ায় প্রায় ২০ হাজার টাকা।
কিন্তু হাতে আছে মাত্র ১০ হাজার টাকা। এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই শুরু হয় হিসাব-নিকাশ। কোথাও থেকে বাকি টাকা জোগাড় করা যায় কি না, তা ভাবা হয়। কেউ ধার নেওয়ার কথা চিন্তা করেন, কেউ আবার খরচের তালিকা ছোট করে ১০ হাজার টাকার মধ্যেই সব সামলানোর চেষ্টা করেন। এই যে আয়-ব্যয়ের হিসাব, টাকার সীমার মধ্যে পরিকল্পনা করা—অর্থনীতিবিদদের ভাষায় এটাই বাজেট।
একজন ব্যক্তি যেমন নিজের মাসিক আয় অনুযায়ী খরচের পরিকল্পনা করেন, তেমনি সরকারও পুরো দেশের আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা তৈরি করে। তবে তা এক মাসের নয়, পুরো এক বছরের জন্য।
প্রতি বছর জুনের শুরুতে এই বাজেটকে ঘিরে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়। খবরের কাগজ, টেলিভিশন আর সাধারণ মানুষের আলোচনায় উঠে আসে এর নানা দিক। তবে কোনো কোনো বছর বিশেষ পরিস্থিতিতে তারিখে কিছুটা পরিবর্তন হয়। যেমন এবার সংসদে বাজেট উপস্থাপন করা হবে ১১ জুন। প্রশ্ন থেকেই যায়—লাখ লাখ কোটি টাকার এই বিশাল হিসাব আসলে কী বোঝায়? কেন প্রতি বছর এত বড় আয়োজন? আর একজন সাধারণ মানুষের জীবনে এই বাজেটের প্রভাব কতটা গভীর?
বাজেট আসলে কী?
জাতীয় বাজেট বলতে বোঝায় সরকারের আগামী এক বছরের সম্ভাব্য আয় ও ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব। সহজভাবে বললে, এটি হলো সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বার্ষিক রূপরেখা, যেখানে ঠিক করা হয় টাকা কোথা থেকে আসবে এবং কোথায় খরচ হবে।
বাংলাদেশে প্রতি বছর জুন মাসে অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে এই বাজেট উপস্থাপন করেন। দেশের আর্থিক পরিকল্পনার এই চক্রটি চলে ১ জুলাই থেকে পরবর্তী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়কে কেন্দ্র করে। এই সময়কালকেই বলা হয় ‘অর্থবছর’। এই অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী মূলত দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন।
প্রথমত, আগামী এক বছরে সরকারের সম্ভাব্য আয় কত হবে এবং সেই আয় কোথা থেকে আসবে। এর মধ্যে থাকে কর, মূল্য সংযোজন কর এবং অন্যান্য রাজস্ব আয়ের উৎস। পাশাপাশি বিবেচনায় থাকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের বিষয়ও।
দ্বিতীয়ত, ওই আয় কীভাবে খরচ করা হবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, পেনশন, উন্নয়ন প্রকল্পসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের পরিকল্পনা এখানে নির্ধারণ করা হয়।
একটি সাধারণ পরিবারের মাসিক বাজেটের সঙ্গে এর তুলনা করা যায়। যেমন—বাড়ি ভাড়া, বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল, বাজার খরচ এবং ভবিষ্যৎ সঞ্চয়ের পরিকল্পনা আগে থেকেই নির্ধারণ করা হয়। সরকারও একইভাবে একটি বৃহৎ পরিসরে, কোটি কোটি মানুষের প্রয়োজন মাথায় রেখে পুরো বছরের জন্য এই হিসাব তৈরি করে।
বাজেট প্রণয়নের উদ্দেশ্য কী?
অনেকে প্রশ্ন করেন, দেশ তো স্বাভাবিকভাবেই চলছে—তাহলে প্রতি বছর এত গুরুত্ব দিয়ে বাজেট ঘোষণার প্রয়োজন কেন? আসলে বাজেট কোনো আলাদা আয়োজন নয়, এটি সরকারের রাজস্ব নীতির বাস্তব রূপ। এই রাজস্ব নীতিতে ঠিক করা হয় সরকার কোথা থেকে কত টাকা সংগ্রহ করবে, কোন উৎস বা কর ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই অর্থ আসবে এবং সেই অর্থ কোথায় ও কীভাবে ব্যয় করা হবে।
বাজেট মূলত সেই পরিকল্পনারই বিস্তারিত প্রকাশ। একটি দেশের চাহিদা অসংখ্য এবং বৈচিত্র্যময়। সীমিত সম্পদের মধ্যে সব কিছু একসঙ্গে করা সম্ভব হয় না। তাই সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অগ্রাধিকার ঠিক করা।
ধরা যাক, কোথাও রাস্তা সংস্কার জরুরি, আবার কোথাও নতুন স্কুল নির্মাণের দাবি রয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ডাক্তার নিয়োগের প্রয়োজনও থাকতে পারে। কিন্তু সব খাতে একসঙ্গে সমানভাবে ব্যয় করা সম্ভব নয়। তাই কোন খাতে কত টাকা বরাদ্দ দেওয়া হবে, সেটি বাজেটেই নির্ধারণ করা হয়।
এ ছাড়া রাজস্ব নীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। অর্থাৎ বাজারে হঠাৎ করে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া বা অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হওয়া ঠেকানো। একই সঙ্গে বাজেটের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানুষের আয় বাড়ানো এবং সামগ্রিকভাবে জীবনমান উন্নয়নের দিকেও নজর দেওয়া হয়।
বাজেট ঘোষণার পদ্ধতি কী?
জাতীয় বাজেট প্রণয়ন কোনো একদিনের কাজ নয়। এটি মাসের পর মাস ধরে চলা একটি বড় প্রশাসনিক ও নীতিগত প্রক্রিয়া। সরকারের নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনার ভিত্তিতে অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় আগেভাগেই বাজেট তৈরির কাজ শুরু করে। বিভিন্ন খাত থেকে তথ্য সংগ্রহ, প্রয়োজন নির্ধারণ এবং বরাদ্দের খসড়া তৈরি করা হয়। এরপর ধাপে ধাপে সেই খসড়া চূড়ান্ত আকার পায়। সাধারণত জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন করেন। তবে বাজেট উপস্থাপন মানেই তার অনুমোদন নয়।
সংসদে এরপর শুরু হয় বিস্তারিত আলোচনা। সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে মতামত, সমালোচনা ও বিতর্ক করেন। কোন খাতে কত বরাদ্দ দেওয়া হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং প্রয়োজনে কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাবও আসে। সব আলোচনা ও পর্যালোচনা শেষে জুন মাসের শেষ দিকে সংসদে ভোটের মাধ্যমে বাজেট অনুমোদন করা হয়। এরপর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের মাধ্যমে এটি আইনে পরিণত হয়। অবশেষে ১ জুলাই থেকে নতুন অর্থবছর শুরু হয় এবং পরবর্তী ৩০ জুন পর্যন্ত সেই বাজেট অনুযায়ীই দেশ পরিচালিত হয়।
ঘাটতি বাজেট বলতে কী বোঝায় এবং ঋণের প্রয়োজন কেন পড়ে?
‘ঘাটতি বাজেট’ বা ‘ডেফিসিট বাজেট’ শব্দটি বাজেট ঘোষণার পর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে। টেলিভিশনের টকশো থেকে শুরু করে সংবাদপত্র—সব জায়গাতেই এই শব্দটি ঘুরে ফিরে আসে।
এই ধারণাটি বোঝার জন্য আবার একটি সাধারণ উদাহরণ ধরা যায়। ধরা যাক, কোনো অনুষ্ঠানের জন্য আপনার খরচ দরকার ২০ হাজার টাকা, কিন্তু হাতে আছে ১০ হাজার টাকা। অর্থাৎ আপনার ১০ হাজার টাকার ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণ করতে আপনি হয়তো কারও কাছ থেকে ধার নেন বা ব্যাংকের সাহায্য নেন। সরকারের বাজেটেও অনেক সময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে সাধারণত সরকারের পরিকল্পিত ব্যয় রাজস্ব আয়ের তুলনায় বেশি হয়। যেমন ধরা যাক, অবকাঠামো, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, স্কুল ও হাসপাতাল নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের ব্যয় পরিকল্পনা দাঁড়াল ৭ লাখ কোটি টাকা। কিন্তু কর, ভ্যাট ও অন্যান্য রাজস্ব থেকে আয় হলো ৫ লাখ কোটি টাকা। এই দুইয়ের পার্থক্য অর্থাৎ ২ লাখ কোটি টাকার ঘাটতিই হলো বাজেট ঘাটতি।
এই ঘাটতি পূরণের জন্য সরকার বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো দেশীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া, সঞ্চয়পত্র বিক্রি এবং বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা যেমন বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ থেকেও সহায়তা নেওয়া হয়।
বাজেট আমাদের জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
লাখ লাখ কোটি টাকার এই বিশাল হিসাব অনেক সময় সাধারণ মানুষের কাছে দূরের বিষয় মনে হতে পারে। মনে প্রশ্ন জাগে—এর সঙ্গে আমার বা আপনার সম্পর্ক কোথায়? আসলে সম্পর্কটা খুবই বাস্তব এবং দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা তা সরাসরি টের পাই।
ধরা যাক, মোবাইল ফোনের সেবার ওপর নতুন কর আরোপ করা হলো বা সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হলো। তখন ফোনে কথা বলা এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের খরচও বেড়ে যায়। অন্যদিকে, যদি কোনো পণ্যে ভ্যাট কমানো হয়, তাহলে বাজারে সেই পণ্যের দাম কমে আসার সম্ভাবনা থাকে। আবার করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হলে তুলনামূলক কম আয়ের মানুষ কিছুটা আর্থিক স্বস্তি পান, কারণ তাদের ওপর করের চাপ কমে যায়।
এছাড়া বাজেটে সামাজিক খাতের বরাদ্দও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়লে সাধারণ মানুষ আরও ভালো সেবা পাওয়ার সুযোগ পান। এতে দীর্ঘমেয়াদে জীবনমান উন্নয়নের পথও তৈরি হয়।
লাখো কোটি টাকার এই হিসাবের শেষ পাতায় আসলে লেখা থাকে আমাদেরই জীবন। কখনো বাজারের দাম, কখনো করের চাপ, আবার কখনো স্বস্তির নিঃশ্বাস। বাজেট তাই শুধু সরকারের দলিল নয়—এটা প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধের নীরব নিয়ন্ত্রক।

