মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে জাপান। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে টোকিও জানিয়েছে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ না হলে তারা কোনো পদক্ষেপ নেবে না।
জাপানের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের আত্মরক্ষা বাহিনী মোতায়েনের আগে তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে চায় দেশটি। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কার্যকর যুদ্ধবিরতি থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, তেহরানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পথ খোলা থাকতে হবে। তৃতীয়ত, পুরো অঞ্চলে নিরাপত্তা ঝুঁকি এমন পর্যায়ে নামতে হবে যাতে সামরিক উপস্থিতি নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি না করে।
টোকিওর এই অবস্থানকে অনেক বিশ্লেষক সতর্ক কূটনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন। কারণ, একদিকে জাপান যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গেও দেশটির দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেওয়ার পরিবর্তে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অনুসরণ করতেই আগ্রহী জাপান।
জানা গেছে, শর্তগুলো পূরণ হলে জাপানি বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব হবে হরমুজ প্রণালিতে ভেসে থাকা বা পরিত্যক্ত মাইন অপসারণ এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অর্থাৎ সরাসরি যুদ্ধ বা সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার পরিবর্তে তারা নিরাপত্তা ও নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
হরমুজ প্রণালি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে থাকে। ফলে এখানে কোনো ধরনের অস্থিরতা দেখা দিলে তার প্রভাব সরাসরি বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি মূল্যের ওপর পড়ে।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত পক্ষগুলোর মধ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই হরমুজকে ঘিরে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এ পর্যন্ত তিনবার টেলিফোনে কথা বলেছেন। এতে বোঝা যায়, টোকিও শুধু সামরিক প্রস্তুতি নয়, কূটনৈতিক যোগাযোগকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
জাপানের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটির মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসে। ফলে এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি হতে পারে জাপান। এ কারণেই চলমান সংকটের সময় নিজেদের কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়ার সিদ্ধান্তও নেয় দেশটি।
বিশ্লেষকদের মতে, জাপানের ঘোষিত তিন শর্ত আসলে শুধু সামরিক সিদ্ধান্তের পূর্বশর্ত নয়; বরং এটি একটি বার্তা যে, মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে যুদ্ধের চেয়ে কূটনীতি ও সংলাপকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে টোকিও। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপরই নির্ভর করবে হরমুজ প্রণালিতে জাপানের ভবিষ্যৎ ভূমিকা।

