নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই একাধিক বিতর্কের মুখে পড়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের আকস্মিক বিদায় সেই উত্তাপকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যাংক খাত সংস্কারে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর নেতৃত্বে ছিলেন ওই গভর্নর। তবে হঠাৎ করেই তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়, যা অর্থনীতিবিদ ও পর্যবেক্ষকদের মধ্যে বিস্ময় তৈরি করে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি আগের দিন অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করলেও তার বিদায়ের কোনো ইঙ্গিত পাননি। ঘনিষ্ঠরা মনে করেন, সামান্য ইঙ্গিত পেলেও তিনি নিজে থেকেই সরে দাঁড়াতে পারতেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক শাসনের জন্য নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশিষ্ট ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অর্থমন্ত্রী এখন এমন এক অর্থনীতি পেয়েছেন যেখানে মূল্যস্ফীতি বেশি, বিনিয়োগ স্থবির এবং বেসরকারি খাতে আস্থা দুর্বল।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মন্তব্য করেন, গভর্নর নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষেত্রে যে নিয়ম ও প্রক্রিয়া থাকা উচিত ছিল, তা অনুসরণ করা হয়নি। তার মতে, এটি অর্থনৈতিক শাসন ব্যবস্থার জন্য দুর্বল বার্তা।
এরপর আসে আরেকটি বিতর্ক। ব্যাংক রেজল্যুশন আইনে একটি ধারা সংযোজন নিয়ে সংসদের ভেতরে ও বাইরে সমালোচনা শুরু হয়। মূলত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অধ্যাদেশ আকারে আনা আইনটি পরবর্তীতে নতুন সরকার পুনর্বিবেচনা করে। পরে আইনে নতুনভাবে ১৮ক ধারা যুক্ত করা হয়।
এই ধারা নিয়ে বিরোধী দল, অর্থনীতিবিদ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও সমালোচনা করে। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এটি বাতিলের সুপারিশ করে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, বাজেট সহায়তার শর্ত হিসেবেও এটি সংশোধনের কথা রয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পাঁচ দশমিক পাঁচ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি নিয়েও বড় চ্যালেঞ্জে পড়েছে সরকার। গত নভেম্বরে নতুন সরকার আসার অপেক্ষায় ষষ্ঠ কিস্তি স্থগিত করা হয়েছিল।
ক্ষমতায় এসে সরকার একদিকে তহবিল সংকট, অন্যদিকে সংস্কার শর্ত—এই দুই চাপের মধ্যে পড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত পুরোনো কর্মসূচি থেকে বের হয়ে নতুন চুক্তির পথে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় অর্থমন্ত্রীকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তবে তিনি তুলনামূলকভাবে পরিস্থিতি ভালোভাবে সামলেছেন।
অর্থনীতির বাস্তব চিত্র বলছে, দীর্ঘদিন ধরেই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। সাময়িকভাবে কমলেও মে মাসে তা আবার বেড়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে, যা ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিনিয়োগ পরিস্থিতিও স্থবির। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। তিন বছরের বিনিয়োগ মন্দা কাটার কোনো লক্ষণ নেই।
সরকারি ব্যয় ও উন্নয়ন কার্যক্রমও পিছিয়ে আছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে। এর সঙ্গে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। অর্থমন্ত্রী এখন বাজেট প্রণয়নের বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। কোথায় কত বরাদ্দ যাবে, ঘাটতি কীভাবে পূরণ হবে—এসব সিদ্ধান্তই তার সামনে মূল প্রশ্ন।
একদিকে বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরেছে। রিজার্ভ ও বিনিময় হার কিছুটা স্থির। প্রবাসী আয়ও ভালো অবস্থানে আছে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ সংস্কার—ব্যাংক, রাজস্ব প্রশাসন ও পুঁজিবাজার—এখনও ধীরগতিতে চলছে। বাজেটের আগে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যা কোভিড-পরবর্তী সময়ের পর সবচেয়ে বড় উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হবে, ব্যাংকগুলো কতটা অংশ নেবে এবং এটি উৎপাদন বাড়াবে নাকি মূল্যস্ফীতি আরও বাড়াবে।
এদিকে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য পরিবার কার্ড কর্মসূচি একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যদি এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়। অর্থমন্ত্রী প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে ব্যবসা সহজ করার কথাও বলছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এ বিষয়ে একটি সময়বদ্ধ রোডম্যাপ প্রয়োজন।
সবশেষে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হলো আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত। অর্থমন্ত্রী নিজেও জানিয়েছেন, এই বাস্তবতায় আগামী দুই বছরের মধ্যে বড় ধরনের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কঠিন।

