বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি ও দাম বৃদ্ধির যে নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে, তার কার্যকর ফলাফল এখনো দৃশ্যমান নয়। বরং উল্টো চিত্রই স্পষ্ট হচ্ছে। একদিকে সরকারকে বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে জনগণের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করা হচ্ছে। ফলে এক ধরনের চক্র তৈরি হয়েছে—যেখানে ভর্তুকি ও মূল্যবৃদ্ধি পাশাপাশি চললেও লোকসান কমছে না।
সম্প্রতি বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ঘাটতি কমাতে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) পাইকারি বিদ্যুতের গড় মূল্য ইউনিট প্রতি ৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৮ পয়সা করা হয়েছে। এতে প্রতি ইউনিটে দাম বেড়েছে ১ টাকা ৩৮ পয়সা। এই বৃদ্ধির ফলে বিপিডিবির অতিরিক্ত আয় দাঁড়াবে প্রায় ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা। তবুও চাপ কমছে না। কারণ একই সঙ্গে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের কাছ থেকে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি নিতে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই লোকসান, ভর্তুকি ও মূল্যবৃদ্ধির চক্রের পেছনে রয়েছে গভীর কাঠামোগত সমস্যা। বিপিডিবির হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় ১৩ টাকা ৯ পয়সা। এর মধ্যে ৫ টাকা ১২ পয়সা ব্যয় হচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জে। অর্থাৎ মোট ব্যয়ের প্রায় ৪০ শতাংশই যাচ্ছে এমন বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য, যেগুলো সব সময় উৎপাদনে থাকে না।
সময়ের সঙ্গে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় অনেক কেন্দ্র উৎপাদনে যেতে পারছে না। জ্বালানি সংকটে কেন্দ্রগুলো অলস থাকলেও চুক্তি অনুযায়ী বিপিডিবিকে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এর বড় অংশই আবার সরকার ভর্তুকি হিসেবে বহন করছে। বিদ্যুৎ খাতের এটিই সবচেয়ে বড় কাঠামোগত অসংগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ উৎপাদন না হলেও সক্ষমতার জন্য ব্যয় বাড়তে থাকলে শুধু ভর্তুকি বা দাম বৃদ্ধি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।
বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় ২০১১ সাল থেকে দ্রুতগতিতে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। তখন বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো জরুরি ছিল। তবে সেই সময় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ চাহিদার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় হয়নি। ফলে স্থাপিত সক্ষমতার বড় অংশ ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি, কিন্তু তার জন্য চার্জ দিতে হচ্ছে।
বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে সরকারি, বেসরকারি ও আমদানিনির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ব্যয় হবে প্রায় ৪৮ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে এই ব্যয় আরও বেড়ে দাঁড়াবে ৫২ হাজার ৬০৮ কোটি টাকায়।
এই বিশাল ব্যয়ের বড় অংশই শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছ থেকেই আদায় করা হচ্ছে বিদ্যুৎ বিল ও ভর্তুকির মাধ্যমে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকার অন্তত ৬২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। চলতি অর্থবছরে ভর্তুকি কিছুটা কমানোর পরিকল্পনা থাকলেও স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় তা ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ বিদ্যুতের দাম বাড়ালেও বিপিডিবির ব্যয় যেমন কমছে না, তেমনি সরকারের ভর্তুকির চাপও কমছে না।
এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের মতে ক্যাপাসিটি চার্জসহ বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় কমানো এখন জরুরি। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ বা অকার্যকর বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো নিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে করা চুক্তি পুনর্বিবেচনা এবং প্রকৃত চাহিদার ভিত্তিতে উৎপাদন সক্ষমতা নতুন করে মূল্যায়ন করাও গুরুত্বপূর্ণ।
জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও নির্ভরযোগ্য করা এবং গ্যাস, কয়লা ও অন্যান্য জ্বালানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করে তুলনামূলক কম ব্যয়ের কেন্দ্রগুলোকে সর্বোচ্চ ব্যবহার করার দিকেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতে প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি এবং মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় আরও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি উৎপাদনের পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোর উন্নয়নেও সমান গুরুত্ব না দিলে গ্রাহক পর্যায়ে কার্যকর সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
বিদ্যুৎ খাতের অধিকাংশ সংকটই নীতি, পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার ফল। তাই সমাধানও আসতে হবে কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে। অন্যথায় ভর্তুকি, লোকসান ও মূল্যবৃদ্ধির এই চক্র থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। জনগণের ওপর বাড়তি চাপ না বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধানের দিকেই এখন মনোযোগ দেওয়ার সময়।

