আগামী বাজেটে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে দেশের সার্বিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বড় ধাক্কা খেতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞ ও ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এ সিদ্ধান্ত প্রথম দিকে ক্ষুদ্র সঞ্চয় ও লেনদেন ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে নিয়ে যেতে পারে। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকের পরিবর্তে বিকল্প চ্যানেলে অর্থ প্রবাহ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন মনে করেন, এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে প্রাথমিকভাবে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি থমকে যাবে। তার মতে, ক্ষুদ্রঋণসহ বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে লেনদেন সরে যেতে পারে। তবে দুই বছরের মধ্যে ধাক্কা সামাল দেওয়া গেলে দীর্ঘমেয়াদে এটি ইতিবাচক ফলও দিতে পারে। এজন্য কর ব্যবস্থা সহজ করা এবং কর নিয়ে ভীতি কমানো জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘিরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রস্তাবগুলো নিয়েও আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, একদিকে ব্যবসায়ীদের জন্য শুল্ক ও কর সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে, অন্যদিকে মধ্যবিত্তের ওপর করের চাপ বাড়তে পারে।
সূত্র অনুযায়ী, শিল্প সুবিধার আওতায় বন্ড ব্যবস্থায় বড় ধরনের ছাড় আসছে। ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ আরও বিস্তৃত করা হচ্ছে। পাশাপাশি বন্ড অডিটের বাধ্যবাধকতা শিথিল এবং জেনারেল বন্ডের মেয়াদ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উৎসাহিত করতে সৌরবিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক কারখানা এবং চার্জিং স্টেশন স্থাপনের যন্ত্রপাতিতে শুল্ক ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির আমদানি শুল্ক কমানো, প্লাগ ইন হাইব্রিড গাড়ির করহার হ্রাস এবং গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ফি কমানোর উদ্যোগও বাজেটে থাকতে পারে।
এছাড়া মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পাটজাত পণ্য, ক্রোকারিজ ও ডায়াপারসহ একাধিক পণ্য ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে শুল্কমুক্ত আমদানির সুবিধা পেতে পারে বলে জানা গেছে।
বিনিয়োগ বাড়াতে অফডক ও আইসিডি মালিকানায় বিদেশি অংশীদারিত্বের সীমাবদ্ধতাও শিথিল করা হচ্ছে। ফলে বিদেশিরাও এসব খাতে সরাসরি অংশ নিতে পারবেন।
অন্যদিকে, মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য বাজেটে কর কাঠামোতে পরিবর্তন আসতে পারে। করের প্রথম স্তর ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। করমুক্ত আয়সীমা সামান্য বাড়ানো হলেও কর রেয়াত কমিয়ে দেওয়া হতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে মধ্যবিত্তের ওপর করভার বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।
সূত্র বলছে, ব্যবসায়ীদের জন্য একাধিক কর ও শুল্ক সুবিধা বাড়লেও সাধারণ করদাতাদের জন্য তেমন স্বস্তি নেই। কর কাঠামোতে পরিবর্তন এবং ব্যাংকিং খাতে নতুন শর্ত যুক্ত হলে সাধারণ সঞ্চয়কারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিআইএন বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে কর প্রশাসন সহজ করা, অনলাইন সেবা উন্নত করা এবং করভীতি কমানো জরুরি। তা না হলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যেতে পারে, বিশেষ করে গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকায়।
সব মিলিয়ে আসন্ন বাজেটকে কেন্দ্র করে একদিকে ব্যবসায়িক সুবিধার বিস্তার এবং অন্যদিকে মধ্যবিত্তের ওপর কর চাপ বৃদ্ধির একটি দ্বৈত চিত্র তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

