প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন বেইজিং সফরকে কেন্দ্র করে চীনা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন নিশ্চিত করার দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে একাধিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি উন্নয়ন প্রকল্পের তালিকা অনুযায়ী চীন সরকারের আর্থিক সহায়তা, এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক থেকে বিভিন্ন প্রকল্পে ৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ঋণ প্রস্তাব এখন আলোচনায় রয়েছে। এর বাইরে অগ্রাধিকারভিত্তিতে কোন কোন প্রকল্প চীনা অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে, সে বিষয়ে তালিকা চেয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ। তালিকা পাওয়ার পর তা একত্র করে নতুন প্রস্তাবনা তৈরি করা হবে।
আগামী ২৩ থেকে ২৬ জুনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই সফরকে সামনে রেখে বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অবকাঠামো খাতে অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে ঢাকায় প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে।
চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আনার লক্ষ্য নিয়ে বেইজিংয়ে আগামী ২৪ জুন একটি বিনিয়োগ সম্মেলনের আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এই আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নিতে পারেন বলে আশা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সফরকালে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে কেরানীগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে একটি চীনা কোম্পানিকে জমি বরাদ্দ এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে ডেভেলপার নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয় রয়েছে।
এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে থাকা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে গতি ফেরাতে তিস্তা ব্যারেজ এবং মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নের মতো প্রকল্পেও চীনা অর্থায়ন নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। মোংলা বন্দরের কাছে নতুন একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার আগ্রহও প্রকাশ করেছে চীন। আসন্ন সফরে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা আরও এগিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব:
প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন চীন সফরকে সামনে রেখে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ জোরদার হয়েছে। এ সফরে বাংলাদেশ-চায়না মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি আলোচনা দ্রুত শুরু করার প্রস্তাব দিয়েছে চীন। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা বাংলাদেশ-চীন বিনিয়োগ চুক্তি দ্রুত হালনাগাদ করার বিষয়েও অগ্রগতি চায় দেশটি।
চীনের পক্ষ থেকে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতার প্রস্তাব এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে দুই দেশের মধ্যে মুদ্রা বিনিময় চুক্তি, ব্যাংকিং ও আর্থিক সহযোগিতা সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এবং পারস্পরিক ভিত্তিতে চীনা ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার পরিধি আরও বাড়াতে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় বাণিজ্য, সবুজ উন্নয়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃষি, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং আর্থিক খাতে যৌথ কাজের সুযোগ নিয়েও আলোচনা হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আসন্ন বিনিয়োগ সম্মেলনে বাংলাদেশ তার বিনিয়োগ সম্ভাবনা, অগ্রাধিকার খাত এবং ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে নেওয়া বিনিয়োগবান্ধব নীতি চীনা বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরবে।
এদিকে চট্টগ্রামে চীন অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়টি সামনে আনতে ডেভেলপার নিয়োগ সংক্রান্ত একটি চুক্তি অনুমোদন করেছে সরকার। গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
চীনের বাজারে বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি:
চীনের কুনমিংয়ে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক আমদানি-রপ্তানি এক্সপোতে অংশ নিতে আজ বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ের উদ্দেশে পাঁচ দিনের সফরে যাচ্ছেন বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। এই সফরে তাঁর সঙ্গে থাকছেন রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি এবং বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা। প্রতিনিধিদলে থাকছেন সংশ্লিষ্ট খাতের আরও ব্যবসায়ী নেতারাও।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কুনমিং এক্সপোতে বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য হচ্ছে চীনা বিনিয়োগকারীদের দেশে বিনিয়োগে আগ্রহী করা এবং একই সঙ্গে চীনের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আরও বাড়ানো। এক্সপোতে অংশ নিতে বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মো. খোরশেদ আলমও চীন যাচ্ছেন।
তিনি জানান, বাংলাদেশে নতুন শিল্প স্থাপনে জ্বালানি সংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণে বন্ধ হয়ে থাকা বা সংকটে থাকা শিল্পকারখানাগুলোতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সুবিধা রয়েছে—এমন স্থানে চীনা বিনিয়োগ এনে যৌথভাবে উৎপাদন চালুর বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে। এক্সপোতে চীনা ব্যবসায়ীদের এ বিষয়ে উৎসাহিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় বেইজিংয়ে একটি বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজন করা হয়েছিল। সেই সময়ে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ নিয়ে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে একাধিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। সফরের সময় বাংলাদেশ ৫ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা পাওয়ার প্রত্যাশা করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত চীন ১ বিলিয়ন ইউয়ান অনুদান দেয়, যার পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩৬ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
হান্ডা গ্রুপের সম্ভাব্য বিনিয়োগ পরিকল্পনা:
চীনের হান্ডা গ্রুপ বাংলাদেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ সম্প্রসারণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় অনুষ্ঠিত একটি বিনিয়োগ সম্মেলনে অংশ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এই আগ্রহের কথা জানায়।
সেই সম্মেলনে চীন থেকে হান্ডা গ্রুপের প্রতিনিধিসহ একটি বড় ব্যবসায়ী দল বাংলাদেশ সফর করে। তাদের চট্টগ্রামের জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক এলাকা ঘুরিয়ে দেখানো হয়। পরে প্রতিষ্ঠানটি প্রাথমিকভাবে ১৫০ মিলিয়ন ডলারসহ মোট ২৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করে। এর আগে গত বছরের জুলাইয়ে মীরসরাইয়ের বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৪১ দশমিক ৩৩ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের জন্য চীনা অ্যাপারেল ম্যানুফ্যাকচার কোম্পানিটির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হান্ডা গ্রুপের বিনিয়োগ বাস্তবায়নে এখন নতুন ধাপে অগ্রসর হচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ঢাকার কাছের কেরানীগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রতিষ্ঠানটির জন্য জমি বরাদ্দের একটি চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে ডেভেলপার নিয়োগের বিষয়েও একটি চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে।
৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়ন প্রস্তাব:
চীন সরকারের আর্থিক সহায়তা, এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক থেকে বাংলাদেশে বড় অঙ্কের অর্থায়ন প্রস্তাব অপেক্ষায় রয়েছে। মোট প্রস্তাবিত অর্থায়নের পরিমাণ ৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চীন সরকারের অর্থায়নের অপেক্ষায় থাকা প্রকল্প রয়েছে ৯টি। এসব প্রকল্পে মোট ঋণ প্রস্তাবের পরিমাণ ৪ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার।
এই তালিকায় উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার, মোংলা বন্দরের সুবিধা সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন, চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল উন্নয়ন এবং ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন প্রকল্প। এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের অর্থায়নের অপেক্ষায় রয়েছে ১৭টি প্রকল্প। এসব প্রকল্পে মোট ঋণ প্রস্তাব ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে দুটি প্রকল্পের জন্য ৯০০ মিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তার প্রস্তাব রয়েছে।
এই প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ছয়টি নতুন সেলুলার কন্টেইনার জাহাজ ক্রয়, প্রতিটি আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টিইইউ ধারণক্ষমতাসম্পন্ন, এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের নেটওয়ার্ক আধুনিকীকরণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্প—চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগ এবং রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ।
৯০০ মিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তার মধ্যে ৫০০ মিলিয়ন ডলার চাওয়া হবে জলবায়ু সহনশীল, দক্ষ ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি কর্মসূচির জন্য। আর ৪০০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে পানি সহনশীলতা ও জলবায়ু-স্মার্ট নগর ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির জন্য।
এদিকে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অর্থায়নের তালিকায় রয়েছে ৭টি প্রকল্প। এসব প্রকল্পে মোট ঋণ প্রস্তাব ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। এই তালিকায় রয়েছে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত ডুয়াল গেজ রেললাইন নির্মাণ, তিতাস গ্যাস নেটওয়ার্কের ধারণক্ষমতা ও সরবরাহ দক্ষতা উন্নয়ন এবং ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ গ্যাস নেটওয়ার্ক পরিকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প। সব মিলিয়ে বড় আকারের অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে বিদেশি অর্থায়নের সম্ভাবনা ঘিরে নতুন করে অগ্রগতি আশা করছে সংশ্লিষ্টরা।

