ড. ফাহমিদা খাতুন, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্টডক্টরাল গবেষণা এবং অধ্যাপক জেফ্রি স্যাকসের সঙ্গে যৌথ গবেষণা করেছেন। তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের নন-রেসিডেন্ট সিনিয়র ফেলো ছিলেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ব্র্যাকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত ‘সমতাভিত্তিক ও টেকসই উন্নয়নের জন্য অর্থনীতির পুনঃকৌশল নির্ধারণ এবং সম্পদ সংগ্রহ বিষয়ক টাস্কফোর্স’ এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে (বিবিএস) শক্তিশালী করার জন্য গঠিত টাস্কফোর্সের সদস্য ছিলেন। তিনি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে কথা বলেন।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট আজ সংসদে উপস্থাপিত হতে যাচ্ছে। শুরুতেই জানতে চাই, এ বাজেট ঘোষণার প্রাক্কালে আপনার কী মনে হয়—বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি এবং সবচেয়ে বড় ঝুঁকির জায়গাটা কোথায়?
আমাদের শক্তির জায়গা হচ্ছে আমাদের মানবসম্পদ, আমাদের জনগণ। অনেক সময় বলা হয় মানুষ এখনো সম্পদ হয়ে ওঠেনি। কিন্তু আমি বলব, আমাদের মানবসম্পদই হচ্ছে সবচেয়ে বড় শক্তি। আর এর মধ্যে আমাদের যে তরুণ জনগোষ্ঠী, সেটি আরেকটি বিরাট শক্তি। কারণ তারাই মানবসম্পদ। যদি সত্যিকার অর্থে আমরা তাদের সম্পদে পরিণত করতে পারি, তাহলে অর্থনীতির যে চ্যালেঞ্জগুলো আছে, অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখার ক্ষেত্রে আমরা অনেক দূর এগোতে পারব।
কেন এটা বলছি? দেখেন, অনেক দেশ যারা অনেক আগে উন্নত হয়েছে, উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে, তারা এখন এ জায়গাটাতেই সংকটে আছে। যদিও এখন প্রযুক্তির বিপ্লব হচ্ছে, এআই-ড্রিভেন কর্মকাণ্ড চলছে, এআই-ড্রিভেন সোসাইটি তৈরি হচ্ছে, তার পরও এর পেছনে মানুষের যে মেধাশক্তি লাগে, সেটা কিন্তু অনেক দেশে নেই। সুতরাং এটা একটা বড় ইতিবাচক দিক।
আরেকটি বিষয় হলো মানুষের সহনশীলতা। অনেকে ‘রেজিলিয়েন্স’ শব্দটা পছন্দ করেন না। কিন্তু দেখেন, কতবার আমরা বন্যা, খরা, দুর্যোগ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভাংচুরের মধ্যে থেকেও টিকে থেকেছি। আমাদের যে সহিষ্ণুতা, ধৈর্য এবং ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা আছে, সেটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের আরেকটি শক্তি ছিল সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা। বেশকিছু বছর আমরা মোটামুটি ভালো প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছিলাম। মূল্যস্ফীতিও কম ছিল। অর্থাৎ এটা ছিল খুব ভালো একটি সমন্বয়। আর আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি বৈশিষ্ট্য ছিল—এটি খুব বেশি ওঠানামা করত না। অনেক দেশে একবার বাড়ছে, আবার কমছে। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে একটি স্থিতিশীল অগ্রগতি ছিল। এখন সেটা আর নেই, দুর্বল হয়ে গেছে।
এ স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার পেছনে যেসব সূচক কাজ করেছে, সেগুলো আমরা সবাই জানি। আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত নিম্নমুখী। সরকারের উন্নয়ন ব্যয় বাড়ছে না, ব্যয়ের গুণগত মানও বাড়ছে না। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলার অভাব ও দুর্বলতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এরপর আছে জ্বালানি সংকট। কিছুটা বৈশ্বিক কারণে, কিছুটা আমাদের অভ্যন্তরীণ নীতির কারণে আমরা এ সংকটের মধ্যে আছি।
আমরা দীর্ঘদিন ধরে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে বড় শক্তি হিসেবে দেখে এসেছি। বাস্তবে আমরা সেটাকে সেভাবে কাজে লাগাতে পারিনি। আপনি প্রবৃদ্ধির স্থিতিশীলতার কথা বললেন। কিন্তু জিডিপির আকার, কর-জিডিপি অনুপাত—এসব তথ্য নিয়েও তো এখন প্রশ্ন আছে। যদি প্রবৃদ্ধির তথ্য কিছুটা বাড়িয়ে দেখানো হয়ে থাকে, তাহলে আমরা কি সেটাকে ভিত্তি হিসেবে ধরে রাখব? প্রকৃত চিত্রটা তাহলে কী?
প্রকৃত চিত্রটা যদি একটু খোলাসা করি—আপনি যথার্থই বলেছেন, জনসম্পদের বিষয়টি আমরা পরে আরো আলোচনা করতে পারি যে কেন আমরা এটাকে পুরোপুরি ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডে রূপ দিতে পারিনি। আর তথ্যের ব্যাপারে, জিডিপির আকার বাড়ছে। কিন্তু কর আদায় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে কর-জিডিপি অনুপাত কমে যাচ্ছে। এখন জিডিপির আকার যদি ধরেন কিছুটা কমও হতো, তার পরও এটা সত্য যে আমাদের কর আদায় বাড়ছে না।
আমাদের করজালের ভেতরে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে না। টিআইএনধারীর সংখ্যা এক রকম, কিন্তু নিয়মিত রিটার্ন জমা দেন তার চেয়ে অনেক কম মানুষ। অর্থাৎ করভিত্তি বাড়ছে না। সুতরাং জিডিপির আকার কিছুটা কমলেও এ বাস্তবতা বদলাবে না যে আমাদের কর আদায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং আমাদের প্রয়োজন—দুইয়ের তুলনায়ই খুব কম।
আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। অথচ প্রতিবেশী দেশ নেপাল, ছোট অর্থনীতি, নানা ধরনের ঝুঁকির মুখে থাকা একটি ল্যান্ডলকড দেশ—তারাও জিডিপির প্রায় ১৯ শতাংশ কর আদায় করে। সেখানে আমরা কোথায় আছি? এত প্রবৃদ্ধি করছি, জিডিপির আকারও বড় হওয়ার কথা। ১৮ কোটি মানুষের দেশ। মানুষের কেনাকাটা, লেনদেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তো বাড়বেই। তাই এখানে অবশ্যই তথ্যের যথার্থতা নিয়ে কিছু প্রশ্ন ও সন্দেহ রয়েছে।
তার মানে আপনার কথা থেকে কি ধরে নেয়া যায় যে তথ্যে যেসব অসংগতি আছে, সেগুলো অর্থনীতির প্রকৃত আকারকে খুব বেশি পরিবর্তন করবে না, কিছুটা করবে?
আমার কাছে মনে হয় না যে খুব বেশি পরিবর্তন করবে। আরেকটা বিষয় হলো, বিবিএস বিভিন্ন সময় ভিত্তিবছর পরিবর্তন করে। মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে পরিবর্তন হয়, জিডিপির ক্ষেত্রেও হয়। তখন আগের তথ্যের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা কঠিন হয়ে যায়। একই বেঞ্চমার্কে সবসময় পরিমাপ করা যায় না। আপনি ধরে নিতে পারেন, কিছু পার্থক্য অবশ্যই আছে। কত শতাংশ, সেটা আমি বলতে পারব না। যদি আমি ১০ শতাংশও ধরি, তার পরও আমাদের যে অগ্রগতির ধারা ছিল, সেটা পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না।
এখন প্রায়ই বলা হচ্ছে যে আগের শাসনামলে তথ্যের ম্যানিপুলেশন হয়েছে। যদি সেটা হয়ে থাকে এবং ধারাবাহিকভাবে হয়ে থাকে, তাহলে সংশোধন করলে কিছুটা পরিবর্তন অবশ্যই আসবে। কিন্তু এত বড় জনসংখ্যার একটি দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যে বেড়েছে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যে একসময় বেড়েছিল, যদিও এখন মূল্যস্ফীতির কারণে তা ক্ষয় হয়েছে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বৈচিত্র্যও যে বেড়েছে—এটাও কিন্তু বাস্তবতা।
বলা হচ্ছে বাজেটের আকার হবে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা। এই রাজস্ব আহরণ এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যে আকারগুলোর কথা শুনছি, সেগুলো কতটা বাস্তবসম্মত বলে মনে করেন?
বাজেটের আকার নিয়ে প্রতি বছরই অনেক আলোচনা হয়। এ বছরও বলা হচ্ছে বড় বাজেট আসছে, প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার। আর যখন বাজেটের আকার বলা হয়, তখন প্রশ্ন আসে টাকাটা কোথা থেকে আসবে। আমি প্রথমেই বলতে চাই, বাজেটের আকার নিয়ে আমার তেমন মাথাব্যথা নেই। কারণ আমরা একটি উদীয়মান অর্থনীতি, সামনে এগোতে চাই। আমাদের চাহিদাও অনেক। যেমন রাস্তাঘাট, কানেক্টিভিটি, জ্বালানি প্রয়োজন, তেমনি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও প্রয়োজন রয়েছে। সুতরাং অনেক খাতেই বরাদ্দ দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, একটি রাজনৈতিক সরকার এসেছে, তারা অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জনগণের জন্য একটি বড় বাজেটের মাধ্যমে তাদের আকাঙ্ক্ষা ও কমিটমেন্ট বাস্তবায়ন করতে চায়। কিন্তু বাজেট ছোট না বড় সেটি মূল বিষয় নয়; বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দেখেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একটি সংকোচনমূলক বাজেট দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কারণ মূল্যস্ফীতি বেশি ছিল এবং তারা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দায়িত্বে ছিল।
অনেক প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিতে হয়েছে, আবার টাকাও ছিল না। একদিকে মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ব্যবহার করা হচ্ছে, অন্যদিকে যদি রাজস্বনীতি খুব সম্প্রসারণমূলক হয়ে যায়, তাহলে সমস্যা। এসব বিবেচনায় তারা ওই ধরনের বাজেট করেছিল। কিন্তু দেখেন, সেখানেও বাস্তবায়ন খুব ভালো হয়নি। অনেক কম হয়েছে। তাই মূল বিষয় হচ্ছে ব্যয় করার সক্ষমতা বাড়ানো। দ্বিতীয় বিষয় হলো, শুধু ব্যয় করলেই হবে না। সেই ব্যয় থেকে কী পেলাম, কতখানি অপচয় হলো, কতখানি দুর্নীতি হলো, কতখানি রিটার্ন এল, সেগুলো দেখতে হবে। ব্যয়ের ক্ষেত্রে এগুলোই গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে ব্যয় তো করলাম, কিন্তু সরকারকে পরে আয়ও খুঁজতে হবে। টাকা কোথা থেকে আসবে, সেটাও ভাবতে হবে। বর্তমান ফিসকাল ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে আয়ের উৎসগুলো সীমিত। কর আদায় আগে থেকেই কমছিল এবং ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২২ সালের দিক থেকে অর্থনীতির বেশকিছু সূচক নিচের দিকে নামতে শুরু করে ছিল। এজন্য বর্তমান সরকার বড় একটি রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, কারণ ব্যয়ের সঙ্গে তো সামঞ্জস্য রাখতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেই রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা আছে কিনা। দুই জায়গাতেই সক্ষমতার প্রশ্ন রয়েছে।
করের আওতা বাড়াতে সবচেয়ে জরুরি সংস্কার কোনটি বলে মনে করেন?
করের ক্ষেত্রে অবশ্যই রাজস্ব বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণ ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। এখানে একটি প্রাথমিক শর্ত ছিল, যেটা দেশের ভেতর থেকেও সুপারিশ করা হয়েছে, আইএমএফও অনেক দিন ধরে বলে আসছে। সেটা হলো, কর নীতি প্রণয়ন এবং কর প্রশাসনকে আলাদা করা। আমরা অনেক দিন ধরে বলে আসছি যে এ দুটি বিষয়কে ভাগ করতে হবে। কারণ যে নীতিমালা বানাবে, সে যদি আবার কর আহরণের মধ্যেও যুক্ত থাকে, তাহলে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে। দুই বিভাগকে আধুনিকায়ন করা এবং শক্তিশালী করার কাজ এখনো শুরু হয়নি। এটা হচ্ছে প্রথম ধাপ।
এরপর আসে আদায়ের ক্ষেত্রে অটোমেশন। শুধু ডিজিটাইজেশন নয়, পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন প্রয়োজন। এখন আমরা অনলাইনে রিটার্ন জমা দিচ্ছি, কিন্তু এটা খুব প্রাথমিক পর্যায়ের বিষয়। পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন বলতে কর বিভাগ, ব্যাংক, এনআইডি এবং অন্যান্য ডেটাবেজের মধ্যে সংযোগ থাকবে। করদাতা ও কর আদায়কারীর সরাসরি যোগাযোগ কমে আসবে। উন্নত বিশ্বে যেভাবে হয়, সেদিকে যেতে হবে।
যেহেতু একটি নির্বাচিত সরকার এসেছে, আপনি কি মনে করেন তারা এ রূপান্তর কার্যকরভাবে করতে পারবে?
নির্বাচিত সরকারের একটি রাজনৈতিক শক্তি থাকে। যখন তারা বড় জনসমর্থন নিয়ে নির্বাচিত হয়ে আসে, তখন তাদের পেছনে জনগণের ম্যান্ডেট থাকে। তখন তারা অনেক শক্তিশালী এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে। যেসব সংস্কার সাধারণভাবে অজনপ্রিয় হিসেবে বিবেচিত হয়, সেগুলো সরকার সাধারণত মেয়াদের শুরুতে করতে চায়। কারণ পাঁচ বছর পর আবার নির্বাচন হবে। শেষের দিকে এসে কেউ সাধারণত কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে চায় না। তাই প্রথম বছরেই যদি তারা এ সংস্কারগুলো করে ফেলতে পারে, তাহলে পরবর্তী সময়ে বাস্তবায়ন এগিয়ে নেয়া সহজ হবে। আর কোনো সংস্কারের ফল তো সঙ্গে সঙ্গে আসে না, সময় লাগে। সেই সময়টাও তারা পাবে।
রাজস্ব ঘাটতি পূরণে ঋণনির্ভরতা বাড়ছে। এটি অর্থনীতির জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?
বাজেট ঘাটতি তো অনেক দেশেই থাকে। বাজেট ঘাটতি নিজে কোনো খারাপ বিষয় নয়। কিন্তু আমি কীভাবে সেই ঘাটতির অর্থায়ন করছি, সেটাই মূল বিষয়।
আমাদের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, একদিকে অভ্যন্তরীণ উৎস, অন্যদিকে বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নেয়া হচ্ছে। কিন্তু ধীরে ধীরে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎসের, বিশেষ করে ব্যাংকনির্ভর ঋণের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। চলতি অর্থবছরেও এটি অনেক বেড়েছে এবং আগামী অর্থবছরেও এর ওপর নির্ভরতা বাড়ার কথা বলা হচ্ছে। বৈদেশিক অর্থায়নের ক্ষেত্রেও সুযোগ বাড়াতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, বিদেশী সহায়তা বা বাজেটারি সাপোর্ট পাওয়া গেলেও আমরা তা পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারি না। অর্থ পাইপলাইনে পড়ে থাকে।
সরকারের ব্যাংক ঋণের কারণে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কমে। ২০২৫ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহ প্রায় ৪ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে, যা রেকর্ড সর্বনিম্নে দাঁড়িয়েছে। এর মানে, মানুষ বিনিয়োগ করছে না, সবাই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। কিন্তু বর্তমান সরকার তো ব্যক্তি খাতকে চাঙ্গা করতে চায়। আশা করি, আস্থা ধীরে ধীরে ফিরবে। সরকার তো মাত্র কয়েক মাস হলো দায়িত্বে এসেছে। হয়তো বিনিয়োগকারীরা আরো কিছু সময় পর্যবেক্ষণ করবে।
আপনি বেসরকারি খাতের কথা বলছিলেন। নির্বাচিত সরকার আসার পর ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ মানসিকতায় কি কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন?
এখনো দেখছি বিনিয়োগকারীদের অনেকেই চিন্তার মধ্যে আছে। বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশন থেকে, আবার ব্যক্তিগতভাবেও তারা বলছেন যে অনেক কারখানা বন্ধ। পর্যাপ্ত তারল্য নেই, আর্থিক সহায়তা নেই, ফলে তারা কারখানা চালাতে পারছেন না। এ ধরনের কথাই বেশি শোনা যাচ্ছে। প্রায় পাঁচ মাস ধরে আমরা এটাই দেখছি। এর একটা প্রভাব তো আছেই। কারখানা বন্ধ হলে কর্মসংস্থান কোথায় থাকবে?
আরেকটা চিন্তার বিষয় হলো এআইয়ের প্রভাব। অনেক কারখানায় ধীরে ধীরে এমন প্রযুক্তি আসছে, যেখানে মানুষের প্রয়োজন কমে যাবে, ছাঁটাই হবে। একদিকে বিনিয়োগ নেই, অন্যদিকে প্রযুক্তির অনুপ্রবেশ হচ্ছে। এটা ধীরে ধীরে সিস্টেমের মধ্যে ঢুকছে। তখন কর্মসংস্থানের ওপর একটা বড় প্রভাব পড়বে।
বর্তমান সরকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য অনেক লক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু ব্যক্তি খাত এখনো সংকটের মধ্যেই আছে। সেই প্রেক্ষাপটে সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। যেমন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি সহায়তা তহবিল করেছে। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকার একটি রিফাইন্যান্সিং স্কিম (পুনঃঅর্থায়ন) এবং ২০ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দেয়া হবে। কোন খাতে, কীভাবে দেয়া হবে, সেটারও একটি পথরেখা তৈরি করা হয়েছে। এ উদ্যোগগুলো যদি বাস্তবায়ন হয় এবং সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে হয়তো বেসরকারি খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তহবিলের সঠিক ব্যবহার।
আমরা অতীতে দেখেছি, রিফাইন্যান্সিং স্কিমের ক্ষেত্রে প্রশ্ন থাকে যে যারা অর্থ নিচ্ছে তারা আসলেই নির্দিষ্ট কাজেই ব্যবহার করছে কিনা, অথবা অন্য কেউ সুবিধা নিয়ে নিচ্ছে কিনা। এজন্য তদারকি ব্যবস্থা খুব শক্তিশালী হতে হবে। এক্ষেত্রে সবার দাবি, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো যেন বিষয়টি খুব সুচারুভাবে পরিচালনা করে। তহবিলের অর্থ যেন আগের মতো অপব্যবহার না হয়। কারণ তখন কী হবে? টাকা যাবে, কিন্তু উৎপাদন হবে না। ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে।
বাজেটের আকার বড় হওয়া নিজে কোনো সমস্যা নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত উৎপাদন বাড়ে। উৎপাদন হলে কর্মসংস্থান হবে, মানুষের হাতে টাকা আসবে, তারা কেনাকাটা করবে। অর্থনীতির মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হবে। কিন্তু উৎপাদন ছাড়া বাজারে শুধু অর্থ প্রবাহিত হলে সেটাই মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেয়।
এলডিসি উত্তরণ নিয়েও বর্তমানে কথা হচ্ছে। আমাদের এ বছর উত্তরণের কথা ছিল, হয়তো পেছাবে। তবে উত্তরণের প্রাক্কালে দেশের রফতানি খাতের প্রস্তুতি কেমন দেখছেন এবং বাজেটে রফতানিকারক বা আপনারা কী প্রত্যাশা করছেন?
কিছু প্রত্যাশা তো আছেই। কারণ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন যদি আর পিছিয়ে না যায়, তাহলে হয়তো এ বছরের নভেম্বরে হবে। এরপর বাংলাদেশ ইউরোপীয় বাজারে তিন বছরের একটি গ্রেস পিরিয়ড পাবে। চীনও বলেছে তারা ২০২৮ পর্যন্ত কিছু সুবিধা দেবে। কিন্তু তিন বছর সময় খুব বেশি নয়। কারণ বাংলাদেশ ২০১৮ সালেই গ্র্যাজুয়েশনের যোগ্যতা অর্জন করেছে। এত বছর হয়ে গেল, তার পরও আমরা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারিনি।
প্রস্তুতির অন্যতম বড় জায়গা হচ্ছে শুল্ক ব্যবস্থা। বর্তমানে আমরা এলডিসি হিসেবে উন্নত বিশ্বের বাজারগুলোয় শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছি। এর মধ্যে ইউরোপীয় বাজার অন্যতম। তারা ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ ব্যবস্থার অধীনে জিএসপি সুবিধা দিয়ে থাকে। ধীরে ধীরে সেই সুবিধা চলে যাবে।
তখন আমাদের রফতানিকারকদের অন্য দেশের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামতে হবে। অন্যদিকে আমাদেরও প্রস্তুত থাকতে হবে। কারণ এলডিসি হিসেবে আমরা অন্য দেশের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাই, আমরাও এলডিসির বিশেষ সুবিধার কারণে অনেক ক্ষেত্রে পারস্পরিক সুবিধা না দিয়েও চলতে পারি। এটাকে নন-রেসিপ্রোসিটি বলা হয়।
কিন্তু এলডিসি থেকে বের হয়ে গেলে এ নন-রেসিপ্রোসিটির সুযোগ থাকবে না। আমি যে সুবিধা অন্যের কাছ থেকে নিচ্ছি, আমাকেও কিছু ক্ষেত্রে একই ধরনের সুবিধা দিতে হবে। সেই প্রস্তুতি কি আমরা নিয়েছি? আর যদি আমরা অন্যদের আরো বেশি বাজার প্রবেশাধিকার দিই, তাহলে আমাদের রাজস্ব বিভাগেরও আয় কমতে পারে। কারণ আমাদের কর কাঠামো এখনো অনেকাংশে পরোক্ষ করনির্ভর। প্রায় ৩৫ শতাংশ আসে প্রত্যক্ষ কর থেকে, বাকি প্রায় ৬৫ শতাংশ আসে পরোক্ষ কর থেকে। সুতরাং এ ধরনের প্রস্তুতি প্রয়োজন। ধীরে ধীরে বিষয়গুলো যৌক্তিকীকরণ করতে হবে। যেমন কর অব্যাহতি, বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা এগুলো ধীরে ধীরে কমাতে হবে।
কিন্তু সেটা করতে গেলে রফতানিকারকরা চাপের মুখে পড়তে পারেন। তাই তাদের জন্য অন্য ধরনের কী সুবিধা দেয়া যেতে পারে, সেটাও বিবেচনা করতে হবে। বাজেটে সেটা কী আকারে আসবে, আমি জানি না। তবে এ বিবেচনা থেকে কিছু ব্যবস্থা থাকতে পারে।
এরই মধ্যে আমরা দেখছি জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। বৈশ্বিক সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিও জ্বালানি বাজারকে প্রভাবিত করছে। এসব আমাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে কীভাবে প্রভাবিত করছে?
প্রতিযোগিতা সক্ষমতার কয়েকটি দিক আছে। কিছু বিষয় দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত। যেমন রাস্তাঘাট, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, বন্দর সুবিধা। এগুলো আরো উন্নত ও কার্যকর করতে হবে, যাতে সময় কম লাগে। সময় একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যারা বিশ্ববাজারে কাজ করে, তারা জানে—অন্য কোনো দেশ যদি সাতদিনে পণ্য সরবরাহ করতে পারে, আর আমরা যদি এক মাস সময় নিই, তাহলে শুরুতেই আমরা পিছিয়ে পড়ি। আরেকটি বিষয় হলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। দুর্নীতির বিষয়টিও ব্যবসায়ীরা বারবার উল্লেখ করেন। বিভিন্ন ফোরামে তারা ঘুস ও দুর্নীতির সমস্যার কথাও বলে থাকেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানবসম্পদের দক্ষতা। প্রযুক্তি ও রোবট অনেক কাজ নিয়ে নেবে, তবে দক্ষ মানুষের প্রয়োজন থাকবে। সেই দক্ষ মানবসম্পদ আমাদের তৈরি করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, দেশে মানুষ চাকরি পাচ্ছে না, অথচ বিদেশ থেকে দক্ষ জনবল এনে কাজ করানো হচ্ছে। কারণ প্রয়োজনীয় দক্ষতা আমরা তৈরি করতে পারিনি। এটি সমাধান করতে হবে। এর সঙ্গে আরেকটি নতুন বিষয় যুক্ত হয়েছে—বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা। ভূরাজনৈতিক সংকট বাড়ছে। সর্বশেষ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিও আমাদের চ্যালেঞ্জ বাড়াচ্ছে।
কারণ আমরা জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ। জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে কিনতে হয়, যার প্রভাব সরকারের ব্যয়ের ওপর পড়ে। তাই প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে সরকারেরও দায়িত্ব আছে, আবার রফতানিকারক ও ব্যবসায়ী খাতেরও দায়িত্ব রয়েছে। তাদের কর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে হবে এবং নতুন কমপ্লায়েন্স মানার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো কিছুটা প্রস্তুতি নিচ্ছে, তবে তারা সংখ্যায় খুব বেশি নয়। মাঝারি ও ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো কী করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো মৌলিক খাতগুলোকে কেমন গুরুত্ব দেয়া উচিত?
আমরা বড় বড় অবকাঠামো, এক্সপ্রেসওয়ে, মেগা প্রকল্পে অনেক অগ্রগতি করেছি। কিন্তু শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো সামাজিক অবকাঠামো অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত থেকেছে। প্রথমত, এসব খাতে বরাদ্দ খুবই কম। শিক্ষায় জিডিপির ২ শতাংশেরও কম এবং স্বাস্থ্য খাতে ১ শতাংশেরও কম ব্যয় হয়। এটি দীর্ঘদিন ধরে প্রায় অপরিবর্তিত। এ বরাদ্দ দিয়ে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা বা স্বাস্থ্যসেবা অর্জন সম্ভব নয়। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ অনেক ক্ষেত্রে ব্যয়ের সক্ষমতা সীমিত। অনেক সময় বাজেট থাকলেও তা খরচ করা যায় না।
অন্যদিকে যে ব্যয় হচ্ছে তা কতটা কার্যকর—সেটিও প্রশ্ন। গত ১০-১৫ বছরে স্বাস্থ্য খাতে বড় পরিবর্তন খুব বেশি দেখা যায়নি। বিদেশে চিকিৎসা নেয়ার প্রবণতাও কমেনি। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিতে গেলেও রোগীদের নিজের পকেট থেকে বড় অংশ ব্যয় করতে হয়। বাংলাদেশে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয় প্রায় ৭৫ শতাংশের বেশি, যা দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম উচ্চ হার। অর্থাৎ ১০০ টাকা স্বাস্থ্য ব্যয়ের মধ্যে ৭৫ টাকাই মানুষ নিজে বহন করছে।
এখানে প্রশ্ন হলো, মানুষ আসলে কী পাচ্ছে? পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ বা সেবা মিলছে কিনা? অনেক ক্ষেত্রে ভবন ও যন্ত্রপাতি কেনাতেই ব্যয় সীমিত থাকে, কিন্তু জনবল ঘাটতি থেকে যায়।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। শুধু অবকাঠামো নয়, দক্ষ শিক্ষক প্রয়োজন। শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি পেশার মর্যাদা বাড়াতে হবে। অনেক শিক্ষক নিজেদের অবহেলিত মনে করেন, ফলে মেধাবীরা এ পেশায় আসতে চান না। এ অবস্থার পরিবর্তন না হলে মানসম্মত শিক্ষা সম্ভব নয়। তাই আমি বলব, বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজন অবশ্যই আছে। তবে সেই বরাদ্দ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, সেটাও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
আগামী দুই বছরে অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে কোন তিনটি সংস্কারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া উচিত বলে মনে করেন?
প্রথমেই আমি বলব আয়ের কথা। আমাদের চাহিদার তুলনায় আয় খুবই কম। অর্থাৎ করভিত্তি অত্যন্ত সীমিত। সুতরাং রাজস্ব বিভাগে সংস্কার আনতে হবে। যেটা এরই মধ্যে শুরু হয়েছে, অর্থাৎ নীতি ও প্রশাসনের বিভাজন, সেটার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে হবে। এখানে একদিকে অটোমেশন, অন্যদিকে মানবসম্পদের দক্ষতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। প্রয়োজন হলে জনবলও বাড়াতে হবে।
দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে সরকারি উন্নয়ন ব্যয়। আমরা দেখছি, অপারেশনাল ব্যয় বাড়ছে। কিছু অপারেশনাল ব্যয় স্থায়ী, সেগুলো কমানো সম্ভব নয়। কিন্তু কোথায় অপচয় হচ্ছে, সেগুলো চিহ্নিত করে কমাতে হবে।
অন্যদিকে উন্নয়ন ব্যয় বাড়াতে হবে এবং উন্নয়ন ব্যয়ের গুণগত মানও নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন আমাদের বড় একটি সমস্যা। প্রকল্প সময়মতো শেষ হয় না, বছরের পর বছর চলে, প্রকল্পের পর প্রকল্প জমে যায়। বাজেট প্রণয়নের আগে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায়ও দেখেছি, এটিই তার অন্যতম বড় উদ্বেগের জায়গা ছিল। কীভাবে প্রকল্পগুলোকে সময়মতো এবং মানসম্পন্নভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ পাবলিক এক্সপেন্ডিচারের গুণগত মান বাড়াতে হবে। তৃতীয় বিষয় হচ্ছে বিনিয়োগ বৃদ্ধি। আমরা এতক্ষণ যেসব সমস্যার কথা আলোচনা করেছি, সেগুলোর সংস্কার করতে হবে, যাতে বিনিয়োগ বাড়ে। আর এর সঙ্গে কর্মসংস্থানও জড়িত। শ্রমবাজারেও কিছু সংস্কারের প্রয়োজন আছে। কারণ বাজারে যে ধরনের দক্ষতার চাহিদা রয়েছে, আমরা কি সেই ধরনের জনশক্তি তৈরি করতে পারছি? দেশের ভেতরে এবং দেশের বাইরে যে সুযোগগুলো আছে, সেগুলো কাজে লাগানোর জন্য আমাদের মানুষকে সেইভাবে গড়ে তুলতে হবে।
এখন পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের পারফরম্যান্স কেমন মনে হচ্ছে?
এখনই চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য সময়টা খুবই কম। তবে এখন পর্যন্ত যেটা দেখছি, তাদের অভিপ্রায় ইতিবাচক। মনে হচ্ছে তারা প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোই বলছেন। লিখিতভাবেও তাদের ইশতাহারে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। অনেক জায়গায় তারা সমস্যাগুলো খুব স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছেন। কোথায় চাপের জায়গা, কোথায় সংস্কারের প্রয়োজন—সেগুলোও তারা যথেষ্ট পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছেন। সেই দিক থেকে আমি বলব, সামগ্রিকভাবে তাদের উদ্দেশ্য ইতিবাচক। এখন দেখার বিষয় হচ্ছে, তারা এগুলো বাস্তবে কীভাবে রূপ দেয়। সে বিষয়ে মন্তব্য করার জন্য আরো সময় প্রয়োজন।
সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখতে হলে জনগণের বাজেট সচেতনতা কতটা জরুরি?
সাধারণ মানুষ বাজেটের সব কারিগরি বিষয় বোঝে না। তারা বাজেট কীভাবে তৈরি হয়, কোথা থেকে টাকা আসে, কোথায় যায়—সেসবও অনেক সময় জানে না। তবে তারা একটি বিষয় খুব ভালোভাবে বোঝে—বাজেট মানেই জিনিসপত্রের দাম বাড়তে পারে। বাজেটের আগে থেকেই দাম বাড়ার একটা প্রবণতা তারা লক্ষ করে।
কিন্তু সাধারণ মানুষের সচেতন হওয়া প্রয়োজন এ কারণে যে তারা যেন সরকারের কাছে নিজেদের দাবিগুলো সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারে। বাজেট কীভাবে তৈরি হয়, সেটাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত অর্থ মন্ত্রণালয় বাজেট প্রণয়ন করে এবং বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠী ও অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে। কিন্তু এসব আলোচনা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রাজধানীকেন্দ্রিক। অথচ প্রকৃত অর্থে একটি জনগণমুখী বাজেট হতে হলে মাঠপর্যায়ের মানুষের চাহিদা জানতে হবে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ কী চায়, কী প্রয়োজন—সেগুলো উঠে আসতে হবে।
এখানে জনপ্রতিনিধিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তারা জনগণের সঙ্গে কথা বলবেন, তাদের চাহিদাগুলো সংগ্রহ করবেন এবং সেগুলো কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তুলে ধরবেন। যদি সেসব বিবেচনায় রেখে বাজেট করা হয়, তাহলে অন্তত কিছুটা হলেও জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। সূত্র: বণিক বার্তা

