বাংলাদেশের আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে ঘিরে অর্থনীতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি ধরে রাখা, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ—এই দুই লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
সাধারণত বড় আকারের বাজেটের সঙ্গে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, ভর্তুকি এবং জনসেবা খাতে বিনিয়োগের বিষয়গুলো জড়িত থাকে। এসব ব্যয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এমন বাস্তবতায় সরকার প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে। দেশের উন্নয়ন চাহিদা এবং অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান পরিসর বিবেচনায় এই বড় বাজেটকে অনেকেই সময়োপযোগী মনে করছেন। তবে এর অর্থায়ন পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কারণ বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারি ঋণ গ্রহণ এবং অতিরিক্ত অর্থের জোগান অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি বিনিয়োগ ও সামগ্রিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৬ সময়ের জন্য নতুন মুদ্রানীতি প্রণয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই লক্ষ্যে সম্প্রতি অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি পরামর্শ সভা আয়োজন করা হয়। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কীভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধারের পথও উন্মুক্ত রাখা যায়।
সভায় অংশগ্রহণকারীরা উল্লেখ করেন, বর্তমানে অর্থনীতি একটি নীতিগত দ্বিধার মুখে রয়েছে। মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে, আবার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি আগের তুলনায় অনেকটাই শ্লথ। এমন পরিস্থিতিতে কঠোর মুদ্রানীতি মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়ক হলেও দীর্ঘ সময় তা বহাল থাকলে বিনিয়োগ কমে যেতে পারে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এ কারণে শুধু সুদহার বা মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর না করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অন্যান্য নীতিগত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথাও আলোচনায় উঠে আসে। বিশেষ করে সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মত দেন অংশগ্রহণকারীরা।
অনেক অর্থনীতিবিদ বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সরবরাহ শৃঙ্খলের ব্যাঘাত এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্যের ওঠানামা অব্যাহত থাকলে মূল্যস্ফীতির চাপ সহজে কমবে না। বরং পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধার ও অর্থনৈতিক গতি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জন আগামী মুদ্রানীতির জন্য অন্যতম বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
আলোচনায় অংশ নেওয়া অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে। তাদের মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। কৃষি খাতে সহায়তা বৃদ্ধি, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বাজার ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা বাড়ানো এবং ব্যাংকিং খাতের দক্ষতা উন্নয়ন মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে ব্যাংকিং সেবা সহজ করা, লেনদেনের ব্যয় কমানো এবং সেবার মান উন্নত করার ওপরও জোর দেন তারা। এতে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়বে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আসবে। বর্তমানে ঋণগ্রহীতাদের দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পরও ঋণ পেতে অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। পাশাপাশি এমন কিছু অতিরিক্ত কাগজপত্র ও প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়, যেগুলোর স্পষ্ট উল্লেখ নীতিমালায় নেই। এর বাইরে বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনাও অনেক সময় ঋণপ্রাপ্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
সভায় ব্যাংক খাতের আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উঠে আসে খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ। বিপুল পরিমাণ অকার্যকর ঋণের বোঝা বহন করায় ব্যাংকগুলোর নতুন করে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণের সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ছে। তবে অংশগ্রহণকারীরা উল্লেখ করেন, অন্তত বর্তমানে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র অনেক বেশি স্পষ্টভাবে জানা যাচ্ছে, যা আগে সবসময় সম্ভব হতো না।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যাংক পুনর্মূলধনীকরণের পাশাপাশি একটি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠনের প্রস্তাবও গুরুত্ব পায়। এমন প্রতিষ্ঠান ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কিনে নেওয়া বা সেগুলোর ব্যবস্থাপনা করবে। ফলে ব্যাংকগুলো তাদের আর্থিক হিসাবপত্রের চাপ কমিয়ে নতুন ঋণ বিতরণ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বেশি মনোযোগ দিতে পারবে। আলোচনায় দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতার কথাও উঠে আসে। সেখানে স্বচ্ছতা, নির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং বাজারভিত্তিক পদ্ধতির সমন্বয়ে পরিচালিত সম্পদ ব্যবস্থাপনা কাঠামো আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিল।
বর্তমানে বাংলাদেশ এমন এক নীতিগত বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সরকার বড় আকারের বাজেটের মাধ্যমে সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতি অনুসরণ করছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বহাল রেখেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই দুই নীতির সমন্বয় অর্থনীতির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে যথাযথ সমন্বয় না থাকলে তা নীতিগত চ্যালেঞ্জও বাড়িয়ে দিতে পারে।
অর্থনীতিতে সাধারণত বড় বাজেটকে প্রবৃদ্ধিমুখী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়। কারণ এ ধরনের বাজেটের মাধ্যমে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি, উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিস্তার, অবকাঠামো নির্মাণ, ভর্তুকি এবং জনসেবার পরিধি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। এসব উদ্যোগ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে একই সময়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করে, তখন অর্থনীতিতে ভিন্ন ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এ ধরনের নীতির আওতায় সাধারণত নীতিগত সুদের হার বাড়ানো, অর্থের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ, ঋণপ্রবাহ সীমিত করা এবং প্রয়োজনে নগদ সংরক্ষণ হার বৃদ্ধি করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো বাজারে অতিরিক্ত চাহিদা কমিয়ে মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনা এবং মূল্যস্থিতি বজায় রাখা।
ফলে একই সময়ে সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতি এবং সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি কার্যকর থাকলে দুটি নীতির মধ্যে এক ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়। একদিকে সরকারি ব্যয় ও বিনিয়োগ বাড়িয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে উৎসাহিত করা হয়, অন্যদিকে ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি ও তারল্য সংকোচনের মাধ্যমে চাহিদা কমানোর চেষ্টা চলে। ফলে নীতিগত সমন্বয়ের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সাম্প্রতিক আলোচনায় জ্বালানি খাতকেন্দ্রিক মূল্যস্ফীতিও বিশেষ উদ্বেগের কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি যেখানে প্রায় ৯ দশমিক ৫ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে, সেখানে জ্বালানিজনিত মূল্যস্ফীতি প্রায় ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে। এতে উৎপাদন, পরিবহন এবং সেবা খাতের ব্যয় বেড়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
অন্যদিকে প্রবাসী আয়ের শক্তিশালী প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পদক্ষেপ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে। যদিও বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয় নিলাম পদ্ধতির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, তবুও এর প্রভাব দেশের অভ্যন্তরীণ তারল্য ব্যবস্থাপনায় পড়ছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।
এদিকে সরকারি ঋণ পরিশোধের ব্যয়ও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৬ অর্থবছরে ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে ব্যয় ছিল প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা। এক দশকেরও কম সময়ের ব্যবধানে ২০২৫ অর্থবছরে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকায়। এর বড় অংশই দেশীয় উৎস থেকে নেওয়া ঋণের বিপরীতে পরিশোধ করতে হচ্ছে। বর্তমানে জাতীয় বাজেটের প্রায় এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি অর্থ ঋণ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদি ঋণনির্ভর অর্থায়নের চাপকে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার যদি অতিরিক্তভাবে ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সুদের হার দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকার ঝুঁকি তৈরি হবে। এর ফলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে এবং বিনিয়োগের গতি কমে যেতে পারে। অর্থনীতির ভাষায় যাকে ‘ক্রাউডিং আউট’ প্রভাব বলা হয়।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ দীর্ঘমেয়াদে ৭ থেকে ৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। কিন্তু উচ্চ সুদের হার, ঋণ অনুমোদনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং অতিরিক্ত প্রশাসনিক জটিলতা ইতোমধ্যে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং উৎপাদন সম্প্রসারণের পথও কঠিন হয়ে উঠছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘ সময় উচ্চ সুদের হার বহাল থাকলে এর প্রভাব শুধু ব্যাংক খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। শিল্প খাতের সম্প্রসারণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, আবাসন খাতের কার্যক্রম এবং ভোক্তাদের ব্যয়—সব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিতে পারে। ফলে সরকার উন্নয়ন ব্যয় বাড়ালেও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত গতি নাও পেতে পারে।
উচ্চ সুদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়ে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায়। ঋণের সুদ পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হওয়ায় উৎপাদনশীল ও উন্নয়নমুখী খাতে ব্যয়ের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। এতে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ইতিবাচক দিকও রয়েছে। এ ধরনের নীতি বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখে এবং অপ্রয়োজনীয় আমদানি চাহিদা কমাতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে এটি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যের চাপে থাকা বাংলাদেশের জন্য এসব সুবিধা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে সতর্কবার্তাও রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, অত্যধিক কঠোর মুদ্রানীতি দীর্ঘ সময় ধরে অব্যাহত থাকলে তার মূল্য অর্থনীতিকে দিতে হতে পারে। এর একটি স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ ধরনের আমদানি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৮ শতাংশ কমেছে। পরবর্তী অর্থবছরে কিছুটা উন্নতির ইঙ্গিত মিললেও প্রবৃদ্ধি এখনো ঋণাত্মক অবস্থানে রয়েছে। এটি বেসরকারি বিনিয়োগের দুর্বলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে মূল্যস্ফীতি এখনো পরিবার ও ব্যবসা—উভয়ের জন্যই অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয়। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় ধরনের পণ্যের উচ্চ মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে অব্যাহত থাকায় মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর, যাদের আয়ের তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।
এ কারণে মূল্যস্ফীতি স্থিতিশীলভাবে নিম্নমুখী না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংককে সতর্ক অবস্থান বজায় রাখতে হতে পারে বলে মত দেন অনেক অর্থনীতিবিদ। তবে তাদের অধিকাংশই একমত যে কেবল মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির সমস্যা পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। এর জন্য রাজস্বনীতি এবং বিভিন্ন কাঠামোগত সংস্কারের কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
আলোচনায় উল্লেখ করা হয়, সরকার ইতোমধ্যে অপ্রয়োজনীয় আমদানিপণ্যের একটি তালিকা নির্ধারণ করেছে। এখন এসব পদক্ষেপ বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে তা মূল্যায়ন করে প্রয়োজন অনুযায়ী নীতিগত সমন্বয় আনা যেতে পারে। একইভাবে সম্প্রতি ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচিও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, কর্মসূচিটি যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা যায় এবং অপব্যবহার রোধ করা সম্ভব হয়, তাহলে এটি বিনিয়োগ ও উৎপাদন খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজস্বনীতির ক্ষেত্রেও কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে অনুৎপাদনশীল ব্যয় হ্রাস, রফতানিমুখী ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতে বেশি গুরুত্ব প্রদান, কর আদায় সক্ষমতা বৃদ্ধি, অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি কমানো এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বাড়ানো।
পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অর্জিত বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখার পাশাপাশি পরিস্থিতির উন্নতি হলে ধীরে ধীরে সুদের হার কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, রফতানি খাত এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য পর্যাপ্ত ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত রাখাও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের ভাষ্য, রাজস্ব সম্প্রসারণের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করা, শুধুমাত্র ভোগব্যয় বৃদ্ধি নয়।
তারা মনে করেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময় বড় আকারের বাজেট এবং সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি স্বভাবতই পরস্পরবিরোধী নয়। বরং সঠিক পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে দুটি নীতিই একই সঙ্গে কার্যকর হতে পারে। তবে ঝুঁকি তৈরি হয় তখনই, যখন বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারের ঋণনির্ভরতা অতিরিক্ত বেড়ে যায় এবং একই সময়ে মুদ্রানীতিও কঠোর অবস্থানে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ চাপে পড়তে পারে, যা শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার আশঙ্কা তৈরি করে।
এর মধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েকটি নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যেগুলোকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক। এনআইটিএ হিসাব চালুর ফলে প্রবাসীরা বৈদেশিক মুদ্রায় আমানত রাখার সুযোগ পাচ্ছেন। পাশাপাশি ৬০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি এবং অন্যান্য বিশেষ অর্থায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে সরকারের ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ উদ্যোগসহ বিভিন্ন স্থানীয় উন্নয়ন কর্মসূচিকেও সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখা হচ্ছে। সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে এসব উদ্যোগ কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং রফতানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
তবে অতীত অভিজ্ঞতা নিয়ে সতর্কতাও রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা স্মরণ করিয়ে দেন, অতীতে ঘোষিত অনেক পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি প্রশাসনিক ও প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। এমনকি মহামারির সময় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তার জন্য চালু করা কিছু কর্মসূচিও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে নতুন কর্মসূচিগুলোর সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে বাস্তবায়নের দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার ওপর।
আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে আসে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত স্বাধীনতা। সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় জরুরি হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব নীতিগত অবস্থান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। কারণ সরকারের ঋণ চাহিদা পূরণের স্বার্থে যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তার মূল লক্ষ্য থেকে সরে আসতে হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে নীতিগত বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অতীতের কিছু অভিজ্ঞতা এ ধরনের ঝুঁকির দিকেই ইঙ্গিত করে।
কয়েকজন অর্থনীতিবিদ সতর্ক করে বলেছেন, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হলে এবং সরকারি বিনিয়োগ উৎপাদনশীল খাতে যথাযথভাবে পরিচালিত না হলে ভবিষ্যতে ঋণঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই রাজস্ব শৃঙ্খলা বজায় রাখা, সরকারি সম্পদের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে রাখতে হবে।
তাদের মতে, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে উৎপাদনশীলতা, রফতানি বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত রাজস্ব সম্প্রসারণ। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ধাপে ধাপে পরিচালিত একটি ভারসাম্যপূর্ণ মুদ্রানীতি অনুসরণ করতে হবে। এই দুই নীতির কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে মূল্যস্থিতি ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি—উভয় লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে। পাশাপাশি স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পরবর্তী সময়ের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়ও দেশের অর্থনীতি আরও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে পারবে।

