ইউক্রেন যুদ্ধের পঞ্চম বছরে এসে রাশিয়ার সামনে নতুন এক বাস্তবতা স্পষ্ট হচ্ছে। এতদিন মস্কোর সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল জনবল। বিশাল জনসংখ্যা, বড় সামরিক শিল্প, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ টেনে নেওয়ার সক্ষমতা—এসব মিলিয়ে রাশিয়া ভাবছিল, সময় শেষ পর্যন্ত তার পক্ষেই কাজ করবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, সেই হিসাব আগের মতো সহজ নেই।
রাশিয়া এখন যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য ধরে রাখতে বিপুল অর্থের প্রলোভন দিচ্ছে। রাস্তার বিলবোর্ড, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপন, স্থানীয় প্রচার—সব জায়গায় তরুণদের সামনে বড় অঙ্কের প্রস্তাব রাখা হচ্ছে। কোথাও ৮০ হাজার ডলারের সমপরিমাণ বোনাসের কথা বলা হচ্ছে। কোথাও বলা হচ্ছে, যুদ্ধের চুক্তিতে সই করলে ১ লাখ ৪০ হাজার ডলার পর্যন্ত ঋণমুক্তির সুযোগ মিলতে পারে। অনেক বিজ্ঞাপনে দেশপ্রেম, বীরত্ব, দ্রুত নাগরিকত্ব এবং আর্থিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি একসঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তবু প্রশ্ন উঠছে, এত অর্থ দিয়েও কি রাশিয়া যথেষ্ট সৈন্য পাচ্ছে?
রুশ অর্থনীতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ইয়ানিস ক্লুগের মূল্যায়ন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে সামরিক নিয়োগ ২০২৫ সালের তুলনায় ২০ শতাংশ কমেছে। আরও ইঙ্গিত আছে, এই কমতি এখনো পুরোপুরি থামেনি। অর্থাৎ, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য রাশিয়া টাকা খরচ করছে, কিন্তু সেই টাকার বিনিময়ে আগের মতো মানুষ পাচ্ছে না।
এই জায়গাতেই পুতিনের দীর্ঘ যুদ্ধকৌশল চাপে পড়ছে। কারণ যুদ্ধ শুধু অস্ত্র, গোলাবারুদ বা তেল আয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। যুদ্ধের সবচেয়ে কঠিন জ্বালানি হলো মানুষ।
রাশিয়ার পুরোনো শক্তি এখন দুর্বল হচ্ছে
ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকেই রাশিয়ার কৌশল ছিল ধীর, দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া। মস্কোর ধারণা ছিল, পশ্চিমা সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ইউক্রেন একসময় ক্লান্ত হবে, আর রাশিয়া তার বড় জনসংখ্যা ও সামরিক উৎপাদনশক্তির ওপর ভর করে যুদ্ধ চালিয়ে যাবে।
ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বাড়ায় রাশিয়ার যুদ্ধভান্ডার নতুন আর্থিক সহায়তা পাচ্ছে। জ্বালানি আয় মস্কোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তেল ও গ্যাস রাশিয়ার অর্থনীতির বড় ভিত্তি। কিন্তু অর্থ থাকলেই যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য তৈরি হয় না।
আন্তর্জাতিক কৌশল বিশ্লেষক নাইজেল গোল্ড-ডেভিসের মতে, এটি রাশিয়ার ইতিহাসে এক অস্বাভাবিক যুদ্ধ। অতীতে রুশ রাষ্ট্র সাধারণত নাগরিকদের বাধ্যতামূলকভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়েছে। কিন্তু এবার রাষ্ট্র বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে মানুষকে যুদ্ধের জন্য রাজি করানোর চেষ্টা করছে। তার ভাষায়, টাকা নিজে যুদ্ধ করে না। এই কথার ভেতরেই বর্তমান সংকটের মূল ব্যাখ্যা আছে।
যদি কেউ গত বছর বিশাল বোনাসের প্রলোভনেও যুদ্ধে যেতে রাজি না হয়, তাহলে এ বছর তাকে রাজি করানো আরও কঠিন। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহতা এখন আরও স্পষ্ট। সামনের সারিতে দুর্ব্যবহার, অপ্রশিক্ষিত সৈন্যদের বিপজ্জনক মিশনে পাঠানো, এমনকি কিছু সৈন্যের কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর মতো আক্রমণ এড়ানোর চেষ্টা—এ ধরনের খবর রুশ সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে।
বিজ্ঞাপনের ভাষা বদলেছে, বাস্তবতা বদলায়নি
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে রাশিয়ার দোলগোপ্রুদনি এলাকায় একটি পোস্টারে চুক্তিভিত্তিক সামরিক সেবার জন্য ৬০ লাখ রুবল থেকে বোনাস দেওয়ার কথা দেখা যায়। এর সমপরিমাণ প্রায় ৮০ হাজার ডলার। রাশিয়ার অনেক অঞ্চলে এই অঙ্ক বহু বছরের আয় থেকেও বেশি। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এলাকার মানুষের কাছে এটি বিরাট প্রলোভন।
কিন্তু যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু অর্থের নয়। একজন সম্ভাব্য সৈন্য ভাবতে বাধ্য—টাকা কি জীবন ফিরিয়ে দিতে পারবে? যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হলে কী হবে? পরিবার কি নিরাপদ থাকবে? চুক্তির শর্ত সত্যিই মানা হবে কি? সামনের সারিতে পাঠানোর আগে যথেষ্ট প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে কি?
এমন প্রশ্নের উত্তর যত অনিশ্চিত হচ্ছে, নিয়োগ তত কঠিন হয়ে উঠছে।
রাশিয়া ইতোমধ্যে বিভিন্ন পথ ব্যবহার করেছে। হাজার হাজার সাবেক বন্দিকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে। উত্তর কোরিয়া থেকে তিন দফায় সৈন্য সহায়তা এসেছে। অভিবাসীদের সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে উৎসাহিত করা হয়েছে। এখন আবার ঋণগ্রস্ত পুরুষদের লক্ষ্য করে বলা হচ্ছে, তারা চুক্তিতে সই করলে ১ লাখ ৪০ হাজার ডলার পর্যন্ত ঋণ পরিশোধে সহায়তা পেতে পারে।
এই সব পদক্ষেপ একদিকে রাশিয়ার আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা দেখায়, অন্যদিকে দেখায় দেশটির জনবল সংকট কত গভীর হচ্ছে।
যুদ্ধক্ষেত্রের চাপ অর্থনীতিতেও পড়ছে
রাশিয়ার সমস্যা শুধু সামরিক নিয়োগে সীমাবদ্ধ নয়। যুদ্ধের জন্য যে বয়সী পুরুষদের দরকার, তাদের বড় অংশ অর্থনীতিরও প্রয়োজন। কারখানা, পরিবহন, নির্মাণ, কৃষি, জ্বালানি, প্রযুক্তি—সব ক্ষেত্রেই শ্রমিক দরকার। যুদ্ধ সেই শ্রমশক্তিকে শুষে নিচ্ছে।
নাইেজল গোল্ড-ডেভিসের ভাষায়, রাশিয়া শুধু ফ্রন্টে পাঠানোর মতো মানুষ খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছে না; সাধারণ অর্থনীতির জন্যও মানুষ খুঁজে পাচ্ছে না। তার মূল্যায়ন অনুযায়ী, রুশ অর্থনীতি ইতিহাসের সবচেয়ে তীব্র শ্রমিক ঘাটতির মুখে পড়েছে।
প্রতিরক্ষা শিল্পে কারখানাগুলো দিনরাত কাজ করছে। অস্ত্র, গোলাবারুদ, ড্রোন, সামরিক যান—সবকিছুর উৎপাদন বাড়ানোর চাপ আছে। কিন্তু কারখানা যদি সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চলে, তাহলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সহজ নয়। নতুন শ্রমিক দরকার। সেই শ্রমিক আনতে হলে বেসামরিক খাত থেকে মানুষ টানতে হয়। এতে বাকি অর্থনীতি দুর্বল হয়।
পশ্চিমা গোয়েন্দা প্রতিবেদনের কিছু অনুমান অনুযায়ী, এই যুদ্ধে প্রায় ৫ লাখ রুশ সৈন্য মারা গেছে। আরও কয়েক লাখ মানুষ বাধ্যতামূলক নিয়োগ এড়াতে দেশ ছেড়েছে। এই দুই প্রবণতা মিলে শ্রমবাজারে বড় শূন্যতা তৈরি করেছে। শ্রমিক কমে গেলে মজুরি বাড়ে। মজুরি বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়ে। উৎপাদন খরচ বাড়লে মূল্যস্ফীতি বাড়ে। ফলে যুদ্ধের সামরিক চাপ ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের রান্নাঘর, বাজার, বিদ্যুৎ বিল ও জীবনযাত্রায় এসে পড়ে।
কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে ক্রেমলিন
রাশিয়ার সামনে এখন কয়েকটি কঠিন পথ আছে। প্রথম পথ হলো আরও বেশি অর্থ দিয়ে নিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা। কিন্তু আগেই দেখা যাচ্ছে, অর্থের প্রলোভন আগের মতো কাজ করছে না। দ্বিতীয় পথ হলো আরও বেশি বিদেশি শ্রমিক ও সৈন্য আনা। ভারত, উত্তর কোরিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে শ্রমশক্তি বা যোদ্ধা নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তৃতীয় পথ হলো আবার জোরপূর্বক সামরিক সমাবেশ।
এই তৃতীয় পথই পুতিনের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে আংশিক সামরিক সমাবেশের পর বহু রুশ নাগরিক দেশ ছাড়ার চেষ্টা করেছিল। জর্জিয়া সীমান্তে দীর্ঘ সারি দেখা গিয়েছিল। ঘটনাটি রুশ সমাজে আতঙ্ক ও অসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল। তাই পুতিন এখন পর্যন্ত একই মাত্রার আরেকটি বাধ্যতামূলক পদক্ষেপ এড়িয়ে চলতে চেয়েছেন।
কিন্তু যুদ্ধ যদি একই গতিতে চলতে থাকে, আর স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ কমতে থাকে, তাহলে ক্রেমলিনকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—যুদ্ধের লক্ষ্য কমাবে, নাকি সমাজ ও অর্থনীতির ওপর আরও কঠোর চাপ দেবে।
গোল্ড-ডেভিসের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ক্রেমলিন শিগগিরই মৌলিক এক সিদ্ধান্তের মুখে পড়বে। হয় রাশিয়ার অর্থনীতি ও সমাজের ওপর যুদ্ধের দাবি আরও ব্যাপকভাবে চাপিয়ে দিতে হবে, নয়তো যুদ্ধের লক্ষ্য সীমিত করতে হবে।
অর্থনীতির ভেতরে চাপ বাড়ছে
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, রাশিয়া এখনো কোনোভাবে পরিস্থিতি সামলাতে পারবে। মস্কো ও বড় শহরগুলোর বদলে দূরবর্তী অঞ্চলে নিয়োগ বাড়ানো, শিক্ষার্থীদের সামরিক চুক্তিতে উৎসাহিত করা, বিদেশি নাগরিকদের অন্তর্ভুক্ত করা—এসব পদ্ধতিতে ক্রেমলিন কিছু সময় কিনে নিতে পারে। প্রতিরক্ষা খাত সর্বোচ্চ সক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছালেও সেটি তাৎক্ষণিক বিপর্যয় নয়—এমন মতও আছে।
তবে অর্থনৈতিক চাপ ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। বিশ্লেষক মারিয়া স্নেগোভায়ার মতে, চলতি বছর যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয় ক্রেমলিনকে কঠিন সমঝোতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সামরিক সদস্যদের বেতন, নিয়োগ খরচ এবং যুদ্ধ-সম্পর্কিত ব্যয়ের বোঝা বছরে কয়েক দশ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাচ্ছে। কিছু অনুমান অনুযায়ী, এই ব্যয় রাশিয়ার মোট কেন্দ্রীয় বাজেটের ৯ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের ২ শতাংশের সমান।
রাশিয়ার অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি স্থবির হচ্ছে। কিছু অর্থনীতিবিদের মতে, মন্দার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। ব্যবসা বন্ধ হচ্ছে, ভোক্তাদের আস্থা কমছে। মজুরি বাড়লেও আয় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল রাখতে পারছে না।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে সরকারি বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। কিন্তু সাধারণ পরিবার যে চাপ অনুভব করছে, তা এই সংখ্যার চেয়ে বড়। ২০২৪ সালের জানুয়ারির তুলনায় খাদ্যদ্রব্যের দাম ১৮ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল আকাশছোঁয়া। বিক্রয় কর ২ শতাংশ পয়েন্ট বাড়ানো হয়েছে। ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কিছু এলাকায় জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। বিমানবন্দরেও বারবার বিলম্ব হচ্ছে।
সংখ্যার হিসেবে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও মানুষের মনে অসন্তোষ কমছে না। বাজারে যখন খাবারের দাম, ভাড়া, জ্বালানি ও বিল বাড়ে, তখন সরকারি পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষকে খুব বেশি সান্ত্বনা দিতে পারে না।
যুদ্ধ সমর্থনে ফাটল ধরতে পারে
দীর্ঘ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ক্লান্তি। প্রথম দিকে রাষ্ট্রীয় প্রচার, দেশপ্রেম ও নিরাপত্তার যুক্তি মানুষের বড় অংশকে এক জায়গায় রাখতে পারে। কিন্তু সময় যত যায়, ক্ষয়ক্ষতি তত দৃশ্যমান হয়। পরিবারে মৃত বা আহত সৈন্যের সংখ্যা বাড়ে। জীবনযাত্রার খরচ বাড়ে। কর বাড়ে। সুযোগ কমে। তখন যুদ্ধের প্রতি আগের সমর্থন দুর্বল হতে পারে।
মারিয়া স্নেগোভায়ার মতে, এই অর্থনৈতিক প্রবণতা যুদ্ধের প্রতি সমর্থন দুর্বল করতে পারে এবং সামাজিক অসন্তোষ বাড়াতে পারে। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেছেন, রুশ সরকার দমনযন্ত্রও শক্তিশালী করছে। অর্থাৎ অসন্তোষ বাড়লেও সেটি প্রকাশের সুযোগ সীমিত হতে পারে।
এখানে রাশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ। ক্রেমলিন সাধারণত লক্ষ্য কমানোর বদলে আরও চাপ বাড়ানোর পথ বেছে নিয়েছে। তাই অর্থনৈতিক সংকট বা জনবল ঘাটতি দেখা দিলেও পুতিন সহজে যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে আসবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং ইতিহাস বলে, মস্কো অনেক সময় চাপের মুখে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেয়।
ইউক্রেনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি রাশিয়ার ক্ষয় বাড়াচ্ছে
রাশিয়ার জনবল সংকটের আরেকটি বড় কারণ হলো ইউক্রেনের যুদ্ধপদ্ধতির পরিবর্তন। যুদ্ধের প্রথম দিকের তুলনায় ইউক্রেন এখন ড্রোন ও প্রযুক্তি ব্যবহারে অনেক বেশি দক্ষ। ছোট ড্রোন, আক্রমণকারী ড্রোন, নজরদারি ব্যবস্থা, স্থলচালিত রোবট—এসব মিলিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার ক্ষয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক যুদ্ধ বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষক কাতেরিনা স্তেপানেঙ্কোর মতে, ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে বিশেষ করে কৌশলগত ড্রোন ব্যবহারে দ্রুত উদ্ভাবন করছে। এর ফলে তুলনামূলক কম সৈন্য ব্যবহার করেও রাশিয়ার ওপর বেশি ক্ষতি চাপানো সম্ভব হচ্ছে।
চলতি বছরের শুরুতে ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেন, তার বাহিনী প্রথমবার শুধু ড্রোন ও রোবট ব্যবহার করে একটি রুশ অবস্থান দখল করেছে। তিনি আরও জানান, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই ইউক্রেন ২২ হাজারের বেশি মানববিহীন স্থল মিশন পরিচালনা করেছে।
মে মাসে ইউক্রেন প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার, অর্থাৎ ৩৯ বর্গমাইলের কাছাকাছি, নিট ভূখণ্ডগত অগ্রগতি দাবি করেছে। ইউক্রেনের সেনাপ্রধান অলেক্সান্দর সিরস্কির মতে, এটি টানা দ্বিতীয় মাস যখন রুশ বাহিনী নিট ভূখণ্ড হারিয়েছে।
পশ্চিমা কর্মকর্তাদের অনুমান অনুযায়ী, রাশিয়ার মাসিক হতাহতের সংখ্যা ৩০ হাজার থেকে ৩৫ হাজারের মধ্যে দাঁড়িয়েছে, যদিও বিভিন্ন হিসাব ভিন্ন হতে পারে। সিরস্কি দাবি করেছেন, মে মাসে ইউক্রেনের ড্রোন অপারেটররা যত রুশ সৈন্য হত্যা বা আহত করেছে, রাশিয়া তত সৈন্য নিয়োগ করতে পারেনি।
এই দাবি পুরোপুরি স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন হলেও প্রবণতাটি গুরুত্বপূর্ণ। যদি ইউক্রেন প্রযুক্তি দিয়ে রাশিয়ার জনবল সুবিধা কমিয়ে দিতে পারে, তাহলে যুদ্ধের ভারসাম্য ধীরে ধীরে বদলাতে পারে।
রুশ সেনাবাহিনীর মান নিয়ে প্রশ্ন
রাশিয়া সংখ্যায় বড় হলেও তার বাহিনীর গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে। সাবেক বন্দি, দ্রুত নিয়োগপ্রাপ্ত অপ্রশিক্ষিত সৈন্য এবং অনুপ্রাণিত নয় এমন সদস্যদের বড় সংখ্যায় ফ্রন্টে পাঠালে বাহিনীর কার্যকারিতা কমে যায়। যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু সৈন্যের সংখ্যা নয়, প্রশিক্ষণ, নেতৃত্ব, মনোবল, সরঞ্জাম ও সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়ার সেনাবাহিনী অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়েছে, কারণ ক্রমেই বেশি সংখ্যায় কম প্রশিক্ষিত মানুষকে সামনের সারিতে পাঠানো হচ্ছে। ড্রোন ইউনিটের মতো দক্ষ বাহিনী গঠনের চেষ্টাও আস্থার সংকটে পড়েছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কিছু ড্রোন অপারেটরকে সামনের সারির স্থল আক্রমণে পাঠিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে যারা বিশেষজ্ঞ ড্রোন ইউনিটে যোগ দিতে পারত, তাদের মধ্যেও ভয় ও অনাস্থা তৈরি হয়েছে।
যদি কোনো তরুণ ভাবে, ড্রোন চালানোর দক্ষতার জন্য তাকে নেওয়া হবে, কিন্তু শেষে তাকে ঝুঁকিপূর্ণ পদাতিক আক্রমণে পাঠানো হতে পারে, তাহলে সে চুক্তিতে সই করার আগে দুবার ভাববে। এই অনাস্থা নিয়োগ প্রচারণার জন্য ক্ষতিকর।
উত্তর কোরিয়ার ভূমিকা এবং রাশিয়ার নির্ভরতা
রাশিয়ার যুদ্ধপ্রচেষ্টায় উত্তর কোরিয়ার ভূমিকা এখন আর গোপন বিষয় নয়। উত্তর কোরিয়া থেকে তিন দফায় সৈন্য সহায়তা এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। ৯ মে ২০২৬ মস্কোর রেড স্কয়ারে বিজয় দিবসের সামরিক কুচকাওয়াজে রুশ ও উত্তর কোরীয় সামরিক সদস্যদের উপস্থিতি প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটি দেখায়, ইউক্রেন যুদ্ধ শুধু রাশিয়া ও ইউক্রেনের সীমায় আটকে নেই; এর সঙ্গে এখন বৃহত্তর আন্তর্জাতিক জোট ও পাল্টা জোটের হিসাব জড়িয়ে গেছে।
উত্তর কোরিয়ার সহায়তা রাশিয়ার জনবল সংকট কিছুটা কমাতে পারে, কিন্তু তা মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। বিদেশি সৈন্য বা শ্রমিক এনে সাময়িক ঘাটতি পূরণ করা যায়, কিন্তু একটি বিশাল যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদে চালাতে হলে নিজের অর্থনীতি, জনসংখ্যা ও সামরিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করতেই হয়।
পুতিনের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ
পুতিনের সবচেয়ে বড় বিপদ যুদ্ধক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক পরাজয় নয়; বরং যুদ্ধের খরচ ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের ভেতরে জমে ওঠা। একটি দীর্ঘ যুদ্ধ রাষ্ট্রকে বাইরে থেকে যেমন ক্লান্ত করে, ভেতর থেকেও তেমন ক্ষয় করে।
রাশিয়ার ক্ষেত্রে ক্ষয় কয়েকটি জায়গায় দেখা যাচ্ছে।
প্রথমত, সৈন্য নিয়োগে চাপ বাড়ছে।
দ্বিতীয়ত, শ্রমবাজারে মানুষ কমে যাচ্ছে।
তৃতীয়ত, প্রতিরক্ষা শিল্প সর্বোচ্চ সক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
চতুর্থত, মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবন কঠিন করছে।
পঞ্চমত, ইউক্রেনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি রাশিয়ার ক্ষয় বাড়াচ্ছে।
ষষ্ঠত, জোরপূর্বক সমাবেশ করলে নতুন সামাজিক অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।
এই সব চাপ একসঙ্গে পুতিনকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে শুধু শক্তির ভাষা যথেষ্ট নাও হতে পারে। তবে রাশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্রেমলিনের আচরণ দেখে মনে হয়, পুতিন সহজে যুদ্ধের লক্ষ্য কমাবেন না। বরং তিনি আরও বেশি অর্থ, আরও বেশি দমন, আরও বেশি বিদেশি সহায়তা এবং সম্ভব হলে আরও বেশি নিয়োগের পথ নিতে পারেন।
ইউক্রেনের জন্য সুযোগ, কিন্তু নিশ্চয়তা নয়
রাশিয়ার জনবল সংকট ইউক্রেনের জন্য সুযোগ তৈরি করছে। যদি রাশিয়া সত্যিই নিয়োগের চেয়ে বেশি সৈন্য হারায়, তাহলে যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে। ইউক্রেনের ড্রোন প্রযুক্তি, রোবট ব্যবহার এবং ছোট ইউনিটভিত্তিক উদ্ভাবন রাশিয়ার সংখ্যাগত সুবিধাকে কিছুটা কমিয়ে দিতে পারে।
তবে এটাও সত্য, রাশিয়ার সামরিক শক্তি এখনো বিশাল। তার অস্ত্রভান্ডার, শিল্পভিত্তি, জনসংখ্যা এবং দমনক্ষমতা ইউক্রেনের তুলনায় অনেক বড়। তাই রাশিয়ার সংকট মানেই ইউক্রেনের দ্রুত বিজয় নয়। বরং এর অর্থ হলো, যুদ্ধের মূল্য রাশিয়ার জন্য আগের চেয়ে বেশি হচ্ছে।
ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রযুক্তিগত সুবিধা ধরে রাখা, পশ্চিমা সহায়তা বজায় রাখা এবং রাশিয়ার ক্ষয় বাড়াতে সক্ষম কৌশল চালিয়ে যাওয়া। অন্যদিকে রাশিয়া চেষ্টা করবে দীর্ঘ যুদ্ধ টেনে ইউক্রেন ও তার মিত্রদের ক্লান্ত করতে।
শেষ কথা
ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে রাশিয়া মনে করেছিল, সময় তার পক্ষে। বড় দেশ, বড় সেনাবাহিনী, বড় সামরিক শিল্প—এসব দিয়ে সে দীর্ঘ যুদ্ধ সহ্য করতে পারবে। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে দেখা যাচ্ছে, সেই শক্তির ভেতরেই ফাটল তৈরি হচ্ছে।
রাশিয়ার হাতে টাকা আছে, তেলের দাম থেকে আয় আছে, অস্ত্র কারখানা চলছে, রাষ্ট্রীয় প্রচার চালু আছে। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে শেষ পর্যন্ত মানুষই দরকার। আর মানুষকে শুধু টাকা দিয়ে অনন্তকাল যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো যায় না।
৮০ হাজার ডলারের বোনাস, ১ লাখ ৪০ হাজার ডলারের ঋণমুক্তি, ৬০ লাখ রুবলের প্রতিশ্রুতি—এসব বড় সংখ্যা। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুর ভয়, আহত হওয়ার ঝুঁকি, পরিবারের অনিশ্চয়তা এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাহীনতার সামনে এসব প্রলোভন আগের মতো কাজ করছে না।
রাশিয়ার জনবল সুবিধা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি, কিন্তু তা দুর্বল হতে শুরু করেছে। ইউক্রেনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সেই দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করছে। এখন প্রশ্ন হলো, পুতিন কি যুদ্ধের লক্ষ্য কমাবেন, নাকি রুশ সমাজ ও অর্থনীতির ওপর আরও কঠোর চাপ দেবেন।
এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো ইউক্রেন যুদ্ধের পরবর্তী অধ্যায় নির্ধারণ করবে।

