২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে পুরোনো অর্থনৈতিক অনুমানের ওপর ভিত্তি করে, যেখানে চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের প্রভাবকে পুরোপুরি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এর ফলে ভর্তুকি এবং ঋণ সুদ পরিশোধের বরাদ্দ কৃত্রিমভাবে কম দেখানো হয়েছে বলে বাজেট নথি, সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা এবং স্বাধীন বিশ্লেষকদের মতামতে উঠে এসেছে।
বাজেট বিশ্লেষকদের মতে, এতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সরকার ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য ভর্তুকি বরাদ্দ নির্ধারণ করেছে ৮৯ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা, যা ২০২৪–২৫ অর্থবছরের প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা কম। শতাংশের হিসাবে এটি প্রায় ১৮ শতাংশ হ্রাস।
একইভাবে, সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এটি আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা কম। অথচ ২০২৬–২৭ অর্থবছরে মোট সরকারি ঋণ দাঁড়ানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে ২৬ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকায়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, সংশোধিত বাজেট ও মধ্যমেয়াদি পূর্বাভাস তৈরি করা হয়েছে গত বছরের নভেম্বর মাসে অনুমোদিত তথ্যের ভিত্তিতে। ওই অনুমোদন দেয় অর্থনৈতিক ও মুদ্রানীতি সমন্বয় কাউন্সিল। পরবর্তীতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কাউন্সিল আবার বৈঠকে বসলেও মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সংকট বিবেচনায় পূর্বাভাস হালনাগাদ করা হয়নি।
বাজেটের সঙ্গে প্রকাশিত মধ্যমেয়াদি নীতি বিবৃতিতে একটি টীকায় বিষয়টি স্বীকারও করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের প্রভাব তথ্যভিত্তিতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি, ফলে কিছু পূর্বাভাস বাস্তব পরিস্থিতিতে অতিমূল্যায়িত মনে হতে পারে।
সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তেল, গ্যাস, কয়লা ও সারসহ আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। অর্থ উপদেষ্টা সম্প্রতি জানান, শুধু চলতি অর্থবছরেই অতিরিক্ত ভর্তুকি ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বেশি। এ পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে এবং আমদানি ও রপ্তানির গতি আবারও দুর্বল হচ্ছে।
সরকারের প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও ঋণ প্রবাহের লক্ষ্য নিয়ে অর্থনীতিবিদরা প্রশ্ন তুলেছেন। সরকারি হিসাবে মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। এরপরও সরকার চলতি অর্থবছরের শেষে এটি ৭ শতাংশে নামার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। রপ্তানি আয় প্রথম ১১ মাসে কমেছে ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ। তবুও বছর শেষে ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি এপ্রিল মাসে কমে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমেছে। অথচ সরকার এটিকে ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য দিয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে বাজেটের এসব লক্ষ্য সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এগুলো অর্জন করা কঠিন।
ভর্তুকি ও ঋণ ব্যয়ে কৃত্রিম সংকোচন:
সরকারি হিসাবে দেখা যায়, ভর্তুকি ব্যয় ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ছিল ১ লাখ ৮ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা। ২০২৫–২৬ সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৯৫ হাজার ৩১ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। আর ২০২৬–২৭ অর্থবছরে আরও কমিয়ে ৮৯ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ঋণ সুদ পরিশোধেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। আগের অর্থবছরে ব্যয় ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ১২৩ কোটি টাকা।
পরবর্তী বাজেটে তা কমিয়ে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, আন্তর্জাতিক পণ্যের দাম স্থিতিশীল না থাকলে বা জ্বালানি মূল্য সমন্বয় না হলে বাস্তবে ভর্তুকি ও সুদ ব্যয় বাজেটের চেয়ে অনেক বেশি হবে। তাদের ধারণা, শুধু ঋণ সুদ পরিশোধেই অতিরিক্ত প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা লাগতে পারে।
সরকার কাগজে দেখিয়েছে, মোট ব্যয়ের মধ্যে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশে আনা হয়েছে। এতে উন্নয়ন বাজেট ও সামাজিক কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। তবে অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং সামাজিক কর্মসূচির অগ্রগতির কারণে অর্থ বছরের শেষ দিকে বরাদ্দ পুনর্বিন্যাস হতে পারে। অর্থমন্ত্রী এবং অর্থসচিব বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি।

