বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশের অর্থনীতি একাধিক চাপের মুখে রয়েছে। দীর্ঘ প্রায় চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সময়ে বেসরকারি বিনিয়োগের গতি মন্থর, কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার প্রত্যাশার তুলনায় কম, ব্যাংকিং খাত নানা দুর্বলতায় আক্রান্ত এবং জ্বালানি খাতও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
এর পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই, বৈদেশিক সহায়তা ছাড়ে বিলম্ব হচ্ছে এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধির ইঙ্গিতও দেখা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটকে ঘিরে সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী মহল ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ছিল বাড়তি প্রত্যাশা।
সরকার এবারের বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তবে এসব লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করবে বাজেটের আর্থিক কাঠামো, রাজস্ব সংগ্রহ, ব্যয় ব্যবস্থাপনা, করনীতি, ঋণ কৌশল এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর।
এবারের বাজেটে রাজস্ব আহরণের জন্য উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ধারাবাহিকভাবে নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশেরও নিচে ছিল। অন্যদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, সামাজিক সুরক্ষা ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। এসব খাতে বিনিয়োগ প্রয়োজনীয় হলেও অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই কাঙ্ক্ষিত ফল আসে না। প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্বল তদারকি এবং প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা উন্নয়ন ব্যয়ের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।ফলে অর্থ সংগ্রহের পাশাপাশি সেই অর্থের দক্ষ ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার আবারও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করার পরিকল্পনা নিয়েছে। স্বল্পমেয়াদে এটি অর্থায়নের প্রয়োজন মেটাতে সহায়ক হলেও এর কিছু সম্ভাব্য ঝুঁকি রয়েছে। সরকারি ঋণগ্রহণ বেড়ে গেলে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা সংকুচিত হতে পারে। একই সঙ্গে সুদের হারের ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এতে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের পরিবর্তে ব্যাংকের অর্থ সরকারি ঋণে কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। যখন সরকার নিজেই বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, তখন ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এবারের বাজেটে বৈদেশিক ঋণ আহরণের লক্ষ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা দেখায়, শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই অর্থ ছাড় নিশ্চিত হয় না। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, ক্রয়প্রক্রিয়ার জটিলতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের শর্ত পূরণে ধীরগতির কারণে গত কয়েক বছরে বৈদেশিক ঋণ ছাড় প্রত্যাশার তুলনায় কম ছিল।
তাই এই লক্ষ্য অর্জন অনেকাংশে নির্ভর করবে প্রশাসনিক দক্ষতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ঋণদাতারা এখন অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে আরও কঠোর শর্ত আরোপ করতে পারেন, যদি তারা ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
বাজেটে কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর, কর ফাঁকি কমানো এবং কর কাঠামো সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ব্যবসা পরিচালনার কিছু জটিলতা কমানোর উদ্যোগও রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর কর প্রশাসন এবং করদাতা সেবার উন্নয়ন রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি উৎপাদন ও বিনিয়োগমুখী খাতে দেওয়া কিছু সুবিধা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে সহায়তা করতে পারে।
বাজেটের অন্যতম আলোচিত সিদ্ধান্ত হলো সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উৎস কর বৃদ্ধি। বাংলাদেশে অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী, পেনশনভোগী, বিধবা নারী এবং নির্দিষ্ট আয়ের বহু মানুষ সঞ্চয়পত্রের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে ব্যাংক আমানতের প্রকৃত রিটার্ন কমে যাওয়ায় অনেকেই সঞ্চয়পত্রকে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে উৎস কর বৃদ্ধি তাঁদের প্রকৃত আয় আরও কমিয়ে দিতে পারে। রাজস্ব বাড়ানোর প্রয়োজন থাকলেও ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের জন্য আলাদা সুবিধা বা পৃথক করহার বিবেচনার সুযোগ ছিল বলে মনে করেন অনেক অর্থনীতিবিদ। একইভাবে বর্তমান ব্যয়বহুল জীবনযাত্রার বাস্তবতায় করমুক্ত আয়সীমা আরও কিছুটা বাড়ানো হলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য তা স্বস্তির কারণ হতে পারত।
বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হলেও বাস্তবে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য আরও গভীর সংস্কার প্রয়োজন। বিনিয়োগকারীদের প্রধান উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে জ্বালানি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা, উচ্চ সুদের হার, নীতিগত স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, ভূমি প্রাপ্তি, বন্দর দক্ষতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা।
দীর্ঘদিন ধরে দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির প্রায় ২২ থেকে ২৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। এই স্থবিরতা কাটাতে হলে সুশাসন, বাস্তব সংস্কার এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। দেশীয় বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগও আকৃষ্ট হবে।
এবারের বাজেটে ব্লক বরাদ্দের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা বা বিশেষ উদ্যোগ বাস্তবায়নে এ ধরনের বরাদ্দ প্রয়োজন হতে পারে। তবে এই অর্থ কোথায়, কীভাবে এবং কোন মানদণ্ডে ব্যয় হবে, সে বিষয়ে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ, সংসদীয় তদারকি এবং শক্তিশালী নিরীক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণকে এবারের বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পরিবার কার্ড কর্মসূচি অন্যতম আলোচিত উদ্যোগ। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এটি নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং দারিদ্র্য কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে উপকারভোগী নির্বাচন এবং সুশাসনের ওপর। জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক ডিজিটাল তথ্যভান্ডার, নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে কর্মসূচিটির কার্যকারিতা আরও বাড়বে।
সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। দুই লক্ষ্যই অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হলেও অর্জন সহজ হবে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ নির্ভর করবে খাদ্য সরবরাহ, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, বিনিময় হার এবং মুদ্রানীতির কার্যকারিতার ওপর।
অন্যদিকে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে বিনিয়োগ, রপ্তানি এবং কর্মসংস্থানে দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন। জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল থাকা, ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরে আসা এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার এগিয়ে গেলে অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় নির্ধারিত লক্ষ্যগুলো কিছুটা উচ্চাভিলাষী বলেই মনে হচ্ছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার এবং প্রবৃদ্ধির গতি ফিরিয়ে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যায়। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষিত লক্ষ্য নয়, বরং বাস্তবায়নের দক্ষতার ওপর। বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের অভাব নয়; বরং কার্যকর প্রতিষ্ঠান, সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি সম্ভব হলে বাজেটের লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনাও অনেক বেড়ে যাবে।
- লেখক : অর্থনীতিবিদ এবং নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ

