করছাড়ের প্রণোদনা দেখিয়ে মানুষের চিন্তাভাবনা বদলানো বা তাদের আকৃষ্ট করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমান। তার মতে, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে করছাড়ের চেয়ে সেবার মান, অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আজ সোমবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: অসুবিধাগ্রস্ত মানুষের জন্য কী আছে?’ শীর্ষক এক সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম এ সংলাপের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সঞ্চালনায় ছিলেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। এছাড়া বক্তব্য দেন গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী, অ্যাকশনএইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির এবং কর গবেষক স্নেহাশীষ বড়ুয়াসহ অন্যরা।
সংলাপে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারের উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন রিজওয়ান রহমান। তিনি বলেন, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকা। অথচ নতুন বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। তার ভাষায়, এর অর্থ হলো এক অর্থবছরের ব্যবধানে প্রায় দ্বিগুণ রাজস্ব আদায়ের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, রাজস্ব আদায়ে শতভাগের কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি কীভাবে অর্জিত হবে, তা স্পষ্ট নয়। অর্থনীতিতে এমন কোনো বড় পরিবর্তন ঘটেছে কি না, যার ভিত্তিতে এই লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সে বিষয়েও পরিষ্কার ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না।
কর সুবিধার সীমাবদ্ধতার প্রসঙ্গ তুলে ডিসিসিআইয়ের সাবেক এই সভাপতি বলেন, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে হলে করছাড়ের প্রলোভনের পরিবর্তে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সেবা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবন্ধীবান্ধব স্থাপনা, বিশেষায়িত সেবা এবং উপযুক্ত কর্মপরিবেশ তৈরির মতো বিষয়গুলো করপোরেট প্রতিষ্ঠানের স্বেচ্ছা উদ্যোগের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। বরং আইনগত বাধ্যবাধকতার মাধ্যমে এসব নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তার মতে, করছাড়ভিত্তিক প্রণোদনার চেয়ে নীতিগত বাধ্যবাধকতা এবং সামাজিক সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ অধিক কার্যকর হতে পারে।
একই অনুষ্ঠানে তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধি ও মানবাধিকারকর্মী রামিসা চৌধুরী বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে হিজড়া ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ রাখা হলেও তা বাস্তবায়নে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বরাদ্দ ঘোষণাই যথেষ্ট নয়; বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান উদ্যোগ নিতে হবে। সমাজের অংশ হয়েও হিজড়া জনগোষ্ঠী এখনও কর্মসংস্থান, বাসাভাড়া, শিক্ষা এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছে। তারা সবার আগে মানুষ এবং সমাজে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার চায়।
রামিসা চৌধুরীর মতে, কেবল সরকারি উদ্যোগ নয়, সমাজের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন প্রয়োজন। হিজড়া ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি সম্মান, সহমর্মিতা এবং ইতিবাচক মনোভাব বৃদ্ধি ছাড়া প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, হিজড়া ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিদ্যমান কর সুবিধা আরও কার্যকরভাবে অব্যাহত রাখা উচিত। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে তাদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যোগ্যতার ভিত্তিতে আনসার, পুলিশ ও কমিউনিটি পুলিশে হিজড়া জনগোষ্ঠীর সদস্যদের নিয়োগের সুযোগ বাড়ানো উচিত। প্রয়োজনে শিক্ষাগত যোগ্যতার কিছু শর্ত শিথিল করার বিষয়ও বিবেচনায় আনা যেতে পারে। একই সঙ্গে বিসিএসসহ সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা সুবিধা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়িয়ে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত জটিলতার কথাও তুলে ধরেন রামিসা চৌধুরী। তিনি বলেন, এনআইডি-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে অনেক হিজড়া নাগরিক ভোটাধিকার প্রয়োগসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই এ সংকট দ্রুত সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

