বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়ছে না কর্পোরেট কর আদায়। দেশের মোট কর রাজস্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসে কোম্পানি কর থেকে। তবে জিডিপির তুলনায় বাংলাদেশে কর্পোরেট কর আদায়ের হার অনেক কম।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি)-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কর্পোরেট আয়কর আদায় জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক ৮ শতাংশের মধ্যে। একই ধরনের অনেক দেশের তুলনায় এই হার প্রায় অর্ধেক। এমনকি লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের কয়েকটি ছোট অর্থনীতির দেশও কর্পোরেট কর আদায়ে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।
কর ফাঁকি, ব্যবসার বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে থাকা, দুর্বল নিরীক্ষা ব্যবস্থা এবং কার্যকর প্রয়োগের অভাবের কারণে কোম্পানি কর আদায় কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে না। পাশাপাশি প্রতিবছর বিভিন্ন খাতে দেওয়া বড় অঙ্কের কর ছাড়ও সরকারের রাজস্ব আয় কমিয়ে দিচ্ছে।
কর্পোরেট কর কম আদায়ের ফলে সরকারের হাতে জনসেবা, অবকাঠামো ও উন্নয়ন কার্যক্রমে ব্যয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ কম থাকে। এতে সরকারকে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), শুল্ক এবং ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়। শেষ পর্যন্ত এর চাপ পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর।
বাংলাদেশে বিভিন্ন খাতকে উৎসাহ দিতে দীর্ঘদিন ধরে কর অবকাশ ও বিশেষ কর সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ, তৈরি পোশাক, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) এবং ইলেকট্রনিকস খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট ৭৩ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকার কর ছাড় পেয়েছে।
ওই বছর কর অব্যাহতি ও কম হারে কর সুবিধার পরিমাণ ছিল মোট প্রত্যক্ষ কর আদায়ের প্রায় ৬৯ শতাংশ। সাবেক জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্মকর্তা অপরূপ কান্তি দাস বলেন, দেশের বড় বড় অনেক খাত যদি কর ছাড় বা বিশেষ সুবিধার আওতায় থাকে, তাহলে কর্পোরেট আয়কর আদায় স্বাভাবিকভাবেই কম থাকবে।
তার মতে, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর কর নীতিতে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত খাতগুলোতে কর সুবিধা কমিয়ে নতুন শিল্প খাতে সীমিত সময়ের জন্য এ ধরনের সুবিধা রাখা উচিত। তিনি বলেন, একসঙ্গে সব কর ছাড় বাতিল করা সম্ভব নয়। তবে আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের জন্য একটি স্পষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে অপ্রয়োজনীয় কর সুবিধা ধাপে ধাপে কমানো দরকার।
করজালের বাইরে বড় অংশের ব্যবসা:
কর্পোরেট কর আদায় কম হওয়ার অন্যতম বড় কারণ দেশের বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ব্যবসা এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ কর ব্যবস্থার বাইরে। তিনি বলেন, ব্যবসাকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা সরকারের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হওয়া উচিত।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার কোম্পানির কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) রয়েছে। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছে মাত্র প্রায় ৪২ হাজার প্রতিষ্ঠান। মোয়াজ্জেম বলেন, কর ফাঁকি ও কর এড়ানোর কারণে বাংলাদেশ বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। সিপিডির একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে কর্পোরেট কর থেকে প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে। এই পরিমাণ অর্থ ওই বছরের জাতীয় বাজেটের প্রায় ১৭ শতাংশের সমান।
গবেষণায় আরও বলা হয়, কর্পোরেট কর ফাঁকির পরিমাণ সময়ের সঙ্গে বেড়েছে। ২০১২ সালে যেখানে এই ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৯৬ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা, পরে তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। মোয়াজ্জেম বলেন, অনেক নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানও তাদের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার পুরো তথ্য প্রকাশ করে না। তার ভাষ্য, দুর্বল নিরীক্ষা, অসম্পূর্ণ আর্থিক বিবরণী এবং কিছু ক্ষেত্রে নিরীক্ষক ও কর কর্মকর্তাদের মধ্যে অনিয়মের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রকৃত সক্ষমতার তুলনায় কম কর দেয়।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন এফআইসিসিআইয়ের সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী বলেন, কম কর আদায়ের পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে। একটি হলো, অনেক প্রতিষ্ঠান সত্যিই লাভ করতে পারছে না এবং ন্যূনতম কর দিচ্ছে। অন্যটি হলো, লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো আয় কম দেখাচ্ছে বা কর আইন ঠিকভাবে মানছে না।
তিনি বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান এক বছর লোকসানে থাকতেই পারে। কিন্তু ১০ বা ২০ বছর ব্যবসা পরিচালনা করেও যদি কখনো কর না দেয়, তাহলে বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তার মতে, কর ফাঁকি শনাক্তে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করেও যারা করযোগ্য আয় দেখাচ্ছে না, তাদের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে।
ওইসিডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোতে মোট কর রাজস্বের গড়ে ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ আসে কর্পোরেট কর থেকে। আর ওইসিডি দেশগুলোতে এই হার ১১ দশমিক ৯ শতাংশ।
বাংলাদেশে এই হার প্রায় ২৫ শতাংশ। তবে এটি কর্পোরেট কর ব্যবস্থার শক্তির কারণে নয়, বরং দেশের সামগ্রিক কর আদায় কম হওয়ার কারণে। মোয়াজ্জেম বলেন, একটি ভারসাম্যপূর্ণ কর ব্যবস্থায় প্রত্যক্ষ করের ভূমিকা বেশি থাকা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো পরোক্ষ করের ওপর বেশি নির্ভরশীল। তিনি বলেন, উন্নত কর কাঠামোতে প্রত্যক্ষ কর মোট রাজস্বের বড় অংশ বহন করে। বাংলাদেশে সেই ভারসাম্য এখনো তৈরি হয়নি।
ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) সভাপতি সাব্বির আহমেদ বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা অর্থনৈতিক সংকটে ব্যবসার মুনাফা কমেছে। তার মতে, কর্পোরেট আয়কর নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের লাভের ওপর। করোনার পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানের লাভ কমেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের আরেকটি বড় সমস্যা হলো করের আওতা বাড়াতে না পারা। ডিজিটাল ব্যবস্থার উন্নয়ন হলেও অনেক একক মালিকানাধীন ব্যবসা ও অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান এখনো কর কাঠামোর বাইরে রয়েছে।
বর্তমানে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির করহার ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ। তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। আর ব্যাংক, বিমা ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য করহার ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ। সাব্বির বলেন, শুধু করহার বেশি হওয়াই প্রধান সমস্যা নয়। বরং ন্যূনতম করের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান কম লাভ বা লোকসানেও করের চাপ অনুভব করে। তিনি কর প্রশাসনে আরও দ্রুত ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু, স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি বাড়ানো এবং করদাতা ও কর্মকর্তাদের সরাসরি যোগাযোগ কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেডের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, বাংলাদেশের করদাতার সংখ্যা কম, কর সুবিধা বেশি এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি বড় হওয়ায় অল্প কিছু নিয়মিত করদাতার ওপর বেশি চাপ পড়ে।
তিনি বলেন, উচ্চ ভ্যাট হার অনেক ব্যবসাকে বিক্রি কম দেখাতে উৎসাহিত করে। পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে কর সুবিধা রাজস্ব ভিত্তিকে দুর্বল করে। তার মতে, কর ব্যবস্থার উন্নয়নে আয় ও সম্পদের তথ্যভান্ডারের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে দুর্বল প্রয়োগ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো করের আওতা বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় কর ছাড় কমানো এবং কর ব্যবস্থায় আস্থা তৈরি করা। তা না হলে অর্থনীতির আকার বাড়লেও সরকারের রাজস্ব আয় কাঙ্ক্ষিত গতিতে বাড়বে না।

