বছরের পর বছর ধরে করদাতাদের একটি বড় অংশ সঞ্চয়পত্র, ডিপিএস, জীবনবিমার প্রিমিয়াম কিংবা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের মাধ্যমে করের বোঝা কিছুটা কমিয়ে আসছেন। এতে একদিকে যেমন ব্যক্তিগত সঞ্চয় গড়ে উঠেছে, অন্যদিকে আয়করেও মিলেছে উল্লেখযোগ্য ছাড়।
কিন্তু সেই পরিচিত কর সুবিধার কাঠামোতেই এবার বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে সরকার। প্রস্তাবিত ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত কমানোর পাশাপাশি সঞ্চয়পত্রের মুনাফার কর ব্যবস্থাতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে করদাতাদের একটি বড় অংশকে আগের তুলনায় বেশি কর দিতে হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে মধ্যম ও উচ্চ আয়ের করদাতাদের ওপর। কারণ একই পরিমাণ করছাড় ধরে রাখতে হলে এখন থেকে তাদের আগের তুলনায় বেশি বিনিয়োগ করতে হবে।
কী বদল আসছে কর রেয়াতে:
এতদিন কর রেয়াত নির্ধারণে তিনটি সীমা বিবেচনায় নেওয়া হতো। করযোগ্য আয়ের ৩ শতাংশ, মোট বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা। এই তিনটির মধ্যে যেটি কম হতো, সেটিই কর রেয়াত হিসেবে গণ্য করা হতো। নতুন প্রস্তাবে এই কাঠামো পরিবর্তন করে করা হচ্ছে করযোগ্য আয়ের ৩ শতাংশ, মোট বিনিয়োগের ১০ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এখানেও যেটি কম হবে সেটিই কর রেয়াত হিসেবে ধরা হবে।
অর্থাৎ বিনিয়োগের ওপর রেয়াতের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমে ১০ শতাংশে নামছে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ কর রেয়াতের সীমা ১০ লাখ টাকা থেকে কমে সাড়ে ৭ লাখ টাকায় নেমে আসছে।
বাস্তবে কতটা প্রভাব পড়বে:
একটি উদাহরণে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। ধরা যাক, একজন করদাতার করযোগ্য আয় সাড়ে তিন কোটি টাকা এবং তিনি এক কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। পুরোনো নিয়মে তিনি সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত কর রেয়াত পেতেন। কিন্তু নতুন নিয়ম কার্যকর হলে একই বিনিয়োগের বিপরীতে তিনি পাবেন সর্বোচ্চ ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অর্থাৎ তার কর রেয়াত কমে যাবে আড়াই লাখ টাকা।
এতে আগের মতো সুবিধা পেতে হলে করদাতাকে আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে। কর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়ার মতে, নতুন ব্যবস্থায় বড় করদাতাদের কর সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে এবং সেই সুবিধা ধরে রাখতে বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া বিকল্প থাকবে না।
সঞ্চয়পত্রে নতুন পরিবর্তন:
সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কর ব্যবস্থাতেও বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। বর্তমানে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে মুনাফার ওপর ৫ শতাংশ এবং এর বেশি হলে ১০ শতাংশ উৎসে কর কাটা হয়। এই করই চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য হয়, ফলে আলাদা করে আর কর দিতে হয় না।
নতুন প্রস্তাবে এই সুবিধা তুলে দেওয়া হচ্ছে। এখন থেকে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা অন্যান্য আয়ের সঙ্গে যোগ হয়ে মোট করযোগ্য আয়ের অংশ হবে। ফলে করদাতার আয় অনুযায়ী ২০, ২৫ বা ৩০ শতাংশ হারে কর দিতে হতে পারে। যদিও উৎসে কাটা কর অগ্রিম কর হিসেবে সমন্বয় করা যাবে। তবে এতে করে সঞ্চয়পত্র বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশের ওপর করের চাপ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কর রেয়াতের পরিমাণ কমলেও করছাড়যোগ্য খাতের তালিকায় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। আগের মতোই করছাড় পাওয়া যাবে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ, ডিপিএস ও মাসিক সঞ্চয় প্রকল্প, জীবনবিমার প্রিমিয়াম, শেয়ারবাজার, মিউচুয়াল ফান্ড, ডিবেঞ্চার, প্রভিডেন্ট ফান্ড, কল্যাণ তহবিল, গোষ্ঠীবিমা, সুপার অ্যানুয়েশন ফান্ড এবং নির্ধারিত সিকিউরিটিজে বিনিয়োগে। এছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ডিপিএস হিসাবে বছরে সর্বোচ্চ ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ওপর কর রেয়াত সুবিধা বহাল থাকছে।
করদাতাদের সময়মতো রিটার্ন জমা দিতে উৎসাহিত করতে নতুন প্রণোদনাও রাখা হয়েছে। ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে করের ওপর ৫ শতাংশ ছাড় পাওয়া যাবে। তবে এই ছাড়ের সর্বোচ্চ সীমা ২৫ হাজার টাকা। নির্ধারিত সময়ের পরে রিটার্ন জমা দিলে ধাপে ধাপে জরিমানা গুনতে হবে।
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের মূল লক্ষ্য রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং কর ছাড়ের সুযোগ ধীরে ধীরে সীমিত করা। সেই কারণেই বিভিন্ন কর রেয়াত ও বিশেষ সুবিধা কমানো হচ্ছে। ফলে যারা এতদিন সঞ্চয়পত্র, ডিপিএস বা জীবনবিমায় বিনিয়োগ করে কর কমাতেন, তাদের এখন নতুন করে হিসাব-নিকাশ করতে হবে। কারণ আগের মতো করছাড় পাওয়া আর সহজ থাকবে না। একই সুবিধা পেতে হলে বাড়াতে হবে বিনিয়োগ, আর সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপরও বাড়তে পারে করের চাপ।
সব মিলিয়ে এবারের প্রস্তাবিত বাজেট করদাতাদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে— কর বাঁচানোর সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে, আর কর পরিকল্পনার গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে উঠছে।

