দেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলো একের পর এক চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশ হওয়ার কথা থাকলেও তা নেমে এসেছে ৮ দশমিক ৩ শতাংশে। সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা চলছে। গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা গেছে গত মে মাসে। একই সময়ে রপ্তানি আয়ে নিম্নমুখী প্রবণতা বজায় রয়েছে। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অনিশ্চয়তা কমার কোনো লক্ষণ নেই। আন্তর্জাতিক অর্থনীতির টানাপোড়েনের প্রভাবও দেশের ভেতরে বাড়ছে। আর্থিক খাতের দুর্বলতাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ব্যবসা ও শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে অর্থনীতির বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান গতি বজায় থাকলে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তাদের মতে, বৈশ্বিক সংকট এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে বিনিয়োগ, শিল্প ও ব্যবসা খাতে কতটা গতি আনা সম্ভব হবে—তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ বছর বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমে যেতে পারে। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতের প্রভাব আগামী বছরও বিশ্ব অর্থনীতিতে ধীরগতি বজায় রাখবে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এমন প্রেক্ষাপটে উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তার মতে, শিল্প, বিনিয়োগ ও কর আদায় বাড়াতে পারলে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হলেও বর্তমান বাস্তবতায় তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সিপিডি, ঢাকা চেম্বারসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ব্যবসার উচ্চ ব্যয় বিনিয়োগ কমিয়ে দিয়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ব্যয় ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিও হ্রাস পেয়েছে। শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। উচ্চ সুদের হার এবং ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহেও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কর রাজস্ব থেকে জিডিপি অনুপাত কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩ শতাংশে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় অনেক কম। তুলনামূলকভাবে ভারতে এই অনুপাত প্রায় ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, বিশেষ করে জ্বালানি ও কাঁচামালের দামের ওঠানামা, আমদানি নির্ভর অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ স্থবির, কর্মসংস্থান সৃষ্টিও দুর্বল এবং আর্থিক খাতে ঝুঁকি বাড়ছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে শিল্প খাতের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে গেছে, যা প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমাচ্ছে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ বলেন, বাজেটের লক্ষ্য সব সময়ই প্রাক্কলন। আয়-ব্যয়ের নির্ধারিত লক্ষ্য যদি ৭০ থেকে ৮০ শতাংশও অর্জিত হয়, তাহলে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য পুরোপুরি অপ্রাপ্য হয়ে যায় না। তবে বাস্তবতা কতটা প্রতিফলিত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তিনি আরও বলেন, প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য শুধু বাজেট নয়, প্রয়োজন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, সুদের হার যৌক্তিক রাখা, কর কাঠামো সহজ করা, ব্যবসা ব্যয় কমানো, নীতিগত স্থিতিশীলতা আনা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। সেখান থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে যাওয়া একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য। তার মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি বিনিয়োগ, উৎপাদন, রপ্তানি ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের উন্নতি ছাড়া এই লক্ষ্য কঠিন।
তিনি আরও জানান, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট এবং সরকারের ব্যাংক ঋণ গ্রহণ বৃদ্ধির কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে, যা বিনিয়োগ সম্প্রসারণে বাধা তৈরি করছে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সহসভাপতি প্রীতি চক্রবর্তী বলেন, লক্ষ্যটি ইতিবাচক হলেও বর্তমান বাস্তবতায় তা অর্জন সহজ নয়। তার মতে, কার্যকর সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং শিল্প খাতের বাধা দূর করতে পারলে সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে বাস্তবায়নই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।

