বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে স্পেন। এ লক্ষ্যে অর্থনৈতিক ও আর্থিক খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারে একটি প্রটোকল চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী স্পেন বাণিজ্যিক ঋণ, কারিগরি সহায়তা, সম্ভাব্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট অর্থায়ন দেবে। এটি অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) কাঠামোর আদলে তৈরি করা হচ্ছে।
এছাড়া স্পেনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, স্পেনের কোম্পানিগুলোকে এসব অর্থায়নভিত্তিক প্রকল্পে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে এসব প্রকল্পে স্পেনের পণ্য ও সেবা ব্যবহারে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ রয়েছে।
সম্প্রতি স্পেন সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তাবটি বাংলাদেশ সরকারের কাছে পাঠানো হয়। এতে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। এর পর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ একটি খসড়া চুক্তি তৈরি করেছে। এখন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মতামত নেওয়া হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি করেছে। তুরস্কও এমন একটি চুক্তির প্রস্তাব দিলেও বাংলাদেশ এখনো সম্মতি দেয়নি। তিনি আরও বলেন, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং জাইকার মতো বড় উন্নয়ন সহযোগীরা সম্প্রতি বাণিজ্যিক সুদে অর্থায়নের প্রস্তাব দিচ্ছে। এ অবস্থায় স্পেনের এই উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সূত্র জানায়, এই কাঠামো চুক্তির আওতায় পরিবহন অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অন্যান্য জ্বালানি অবকাঠামো, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ খাতের সাইবার নিরাপত্তা, পানি ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কৃষি-খাদ্য শিল্প, উদ্ভাবন, ডিজিটালায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রকল্পে অর্থায়ন করা হবে। দুই দেশের সম্মতিতে অন্যান্য খাতেও অর্থায়নের সুযোগ থাকবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার প্রকল্পকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা বলেন, এসব খাতে বাংলাদেশের বড় ধরনের অর্থায়নের প্রয়োজন রয়েছে। তাই এই চুক্তি দুই দেশের জন্যই লাভজনক হতে পারে। এতে বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে সহজে অর্থায়ন পাওয়া যাবে এবং স্পেনের কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিকভাবে আরও সম্প্রসারিত হতে পারবে।
তিনি জানান, স্পেন প্রথম এই ধরনের প্রস্তাব ২০২৪ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে দিয়েছিল। সরকার পরিবর্তনের পর আলোচনা স্থগিত হয়। পরে নতুন প্রশাসনের কাছে আবার প্রস্তাব আসায় আলোচনা পুনরায় শুরু হয়েছে। খসড়া চুক্তিতে একটি দ্বিপক্ষীয় ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের কথাও বলা হয়েছে। এটি বছরে একবার বা প্রয়োজন অনুযায়ী বৈঠক করবে। দুই দেশের বিশেষজ্ঞরাও এসব বৈঠকে অংশ নিতে পারবেন।
চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ঋণের অর্থ দিয়ে শুল্ক, কর বা অন্যান্য সরকারি চার্জ পরিশোধ করা যাবে না। এসব ঋণ সার্বভৌম গ্যারান্টির আওতায় থাকবে এবং দুই দেশ নিজ নিজ জাতীয় আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে।
দুর্নীতি প্রতিরোধে উভয় দেশ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করবে বলেও খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা অবৈধ সুবিধার প্রমাণ পাওয়া গেলে স্পেন সরকার অর্থায়ন স্থগিত, প্রত্যাহার বা ঋণ দ্রুত পরিশোধের দাবি জানাতে পারবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক এক সচিব বলেন, এই ধরনের টায়েড ঋণ ব্যবস্থার কারণে স্পেনের পণ্যের ওপর নির্ভরতা তৈরি হতে পারে। তবে এতে বাংলাদেশ উন্নত ইউরোপীয় প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা খাতে সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ পাবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রকল্প নির্বাচন ও আলোচনার সময় বাংলাদেশকে খুব সতর্ক থাকতে হবে। সুদের হার ও শর্ত যেন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ না ফেলে তা নিশ্চিত করতে হবে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ স্পেনে ২ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে ছিল নিটওয়্যার, ওভেন পোশাক, হোম টেক্সটাইল এবং চামড়া পণ্য।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ স্পেন থেকে ১৪ কোটি ৭০ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। এর মধ্যে মূলত ছিল মূলধনী যন্ত্রপাতি, জলপাই তেল, রাসায়নিক ও শিল্প কাঁচামাল।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির এক প্রকাশনায় বলা হয়, স্পেনের সরকারি ও বেসরকারি খাতের বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার। তবে ২০০১ থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ৮ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন ডলার, যা স্পেনের বৈশ্বিক বিনিয়োগের খুব সামান্য অংশ।
২০২১ সালে তৎকালীন রেলপথমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের নেতৃত্বে একটি বাংলাদেশি প্রতিনিধিদল স্পেন সফর করে। সফরে তিনি স্পেনের পরিবহন, গতিশীলতা ও নগর বিষয়ক মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে স্পেনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ রেলওয়েতে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করা হয়।

