দেশে নতুন কারখানা স্থাপন কিংবা ব্যবসা শুরু করতে উদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিনের অন্যতম বড় অভিযোগ হলো অনুমোদন পেতে অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ। আবেদনের ফাইল কখনো সপ্তাহের পর সপ্তাহ, আবার কখনো মাসের পর মাস বিভিন্ন দপ্তরে আটকে থাকে। নির্ধারিত সময়ে মতামত বা ছাড়পত্র না পাওয়ায় অনেক সময় বিনিয়োগ উদ্যোগও থেমে যায়। এই পরিস্থিতি বদলাতে বড় ধরনের প্রশাসনিক সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থা কোনো মতামত, অনাপত্তি বা ছাড়পত্র না দিলে অনেক ক্ষেত্রে সেটিকে সম্মতি হিসেবে গণ্য করে আবেদন নিষ্পত্তি করা হবে। অর্থাৎ দপ্তরগুলোর নীরবতার কারণে আর কোনো বিনিয়োগ আটকে থাকবে না।
বাজেট ঘোষণায় আরও বলা হয়েছে, ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার জন্য একটি অনলাইনভিত্তিক একক জানালা ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হবে। আবেদন জমা থেকে লাইসেন্স প্রদান পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ সাত দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কোম্পানি নিবন্ধন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
বৈদেশিক বাণিজ্যে সময় ও ব্যয় কমাতে নির্ভরযোগ্য আমদানিকারক এবং কম ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের ক্ষেত্রে ঋণপত্র ব্যবহারের বাধ্যবাধকতাও ধাপে ধাপে শিথিল করার কথা বলা হয়েছে। অনানুষ্ঠানিক খাতে থাকা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে যুক্ত করতে তাদের লাইসেন্স গ্রহণ, নবায়ন এবং নিয়মিত শর্ত প্রতিপালনও সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
দেশে ব্যবসা শুরু করার জটিলতা আন্তর্জাতিক সূচকেও প্রতিফলিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘ডুয়িং বিজনেস’ সূচকে ১০০ স্কোরের মধ্যে বাংলাদেশ পেয়েছিল ৪৫। ১৯০ দেশের মধ্যে তখন দেশের অবস্থান ছিল ১৬৮তম। ব্যবসা শুরু করার সূচকে অবস্থান ছিল ১৩১তম।
‘বিজনেস ক্লাইমেট ইনডেক্স ২০২২-২০২৩’ জরিপে দেখা গেছে, ব্যবসায়ীদের ব্যাংকঋণ পাওয়া আগের তুলনায় আরও জটিল হয়েছে। কর ও ভ্যাট পরিশোধে হয়রানি বেড়েছে। একই সঙ্গে শিল্প ও ব্যবসার জন্য জমি পাওয়া কঠিন হয়েছে। সরকারের নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এসব সমস্যা, সময়ক্ষেপণ এবং প্রক্রিয়াগত জট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকীন আহমেদ মনে করেন, বিনিয়োগ পরিবেশে সবচেয়ে বড় বাধা হলো প্রশাসনিক বিলম্ব। তার মতে, করছাড় বা প্রণোদনার চেয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন উদ্যোক্তা মূলত জানতে চান তার আবেদন কত দিনে নিষ্পত্তি হবে। ঘোষিত সময়সীমা বাস্তবায়ন হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে।
বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, কোনো আবেদন অযৌক্তিকভাবে আটকে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। প্রয়োজনে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণে শাস্তি বা চাকরি হারানোর ঝুঁকিও থাকতে পারে। এতে সেবা প্রদান ব্যবস্থায় ফলাফলভিত্তিক জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে চায় সরকার।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্যও প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও দক্ষ জনবলের কর্মানুমতি সাত দিনের মধ্যে এবং বিনিয়োগকারী ও প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের ভিসা ১০ দিনের মধ্যে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিদেশি কর্মীদের নিরাপত্তা ছাড়পত্রের আবেদন ও যাচাইও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনলাইনে সম্পন্ন হবে।
শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী নেতা সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত করহার দেখার আগে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি ও প্রশাসনিক দক্ষতা বিবেচনা করেন। একটি অনুমোদন পেতে কত দিন লাগবে, তা নিশ্চিতভাবে জানা গেলে বিনিয়োগের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।
বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে আইনি সুরক্ষাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তি সম্প্রসারণ এবং দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি হালনাগাদ ও বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া, এক কোটি টাকা পর্যন্ত অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার হস্তান্তরে মূল্যায়ন প্রতিবেদন লাগবে না। ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত চুক্তির অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন ছাড়াই পাঠানো যাবে।
বৈধ বিদেশি বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফা এবং অনাবাসী বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির অর্থ দেশে ফেরত বা পুনঃবিনিয়োগের প্রক্রিয়া এক কর্মদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচিত শিল্পাঞ্চল ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ সুবিধা চালুর কথাও বলা হয়েছে, যাতে প্রস্তুত অবকাঠামো ব্যবহার করে দ্রুত উৎপাদন শুরু করা যায়।
সরকারের মতে, এসব পরিবর্তন শুধু বিনিয়োগকারীদের ভোগান্তি কমাবে না, বরং শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিও বাড়াবে। দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জট কাটিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তোলাই এখন মূল লক্ষ্য।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ আলোচনায় সাধারণত অবকাঠামো, জ্বালানি বা করব্যবস্থা গুরুত্ব পায়। তবে প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সময়মতো সেবা প্রদানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদন দেওয়ার সংস্কৃতি চালু হলে বিনিয়োগ ব্যয় কমবে এবং ব্যবসা সহজ হবে।

