বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বড় ধরনের রূপান্তরের পথে নিতে একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা সামনে এনেছে নির্বাচিত বিএনপি সরকার। প্রস্তাবিত বাজেটে এই রূপান্তরের কৌশল ও লক্ষ্য বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। লক্ষ্য অনুযায়ী আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের বিনিয়োগের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সরকারি পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় মোট বিনিয়োগ যেখানে ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ ছিল, তা ২০২৮-২৯ অর্থবছরে বাড়িয়ে ৩৬ দশমিক ৮২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ তিন বছরের ব্যবধানে বিনিয়োগ প্রায় ৮ দশমিক ২৮ শতাংশ বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই বড় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে চারটি প্রধান কৌশল তুলে ধরা হয়েছে।
- প্রথমত, বিভিন্ন খাতে নিয়ন্ত্রণ শিথিল বা বিনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। এর আওতায় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে কেন্দ্র করে সংস্কার কার্যক্রম নেওয়া হবে।
- দ্বিতীয়ত, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি কাঠামো শক্তিশালী করা এবং প্রকল্পের পাইপলাইন সম্প্রসারণ।
- তৃতীয়ত, ঋণের সুদহার কমাতে ধাপে ধাপে মুদ্রানীতি শিথিল করা।চতুর্থত, আর্থিক ও পুঁজিবাজার সংস্কারের মাধ্যমে
- ঋণ মধ্যস্থতা ব্যবস্থা পুনর্গঠন এবং শেয়ারবাজারের কার্যকারিতা ও গতিশীলতা বৃদ্ধি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব কৌশলের পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পকে সহায়তা দিতে উৎপাদন খাতে কাঁচামাল আমদানিতে করছাড় ও বিশেষ শুল্ক অব্যাহতি সুবিধা বাড়ানো হয়েছে।
এ ছাড়া যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সামাজিক অবকাঠামো খাতে সমস্যাগুলো সমাধান করে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, প্রতিরক্ষা ও আরও কয়েকটি বড় মন্ত্রণালয়ে মোট বাজেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ বা বরাদ্দ বাড়ালেই বিনিয়োগ বৃদ্ধি নিশ্চিত করা যায় না। সরকারি ক্রয়ের স্বচ্ছতা, প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং গুণগত মান নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি প্রকল্প ব্যয়ের অতিরিক্ত বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে না আনলে লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে।
তবে প্রস্তাবিত সংস্কার কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন হলে এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে ঋণের ব্যয় কমতে শুরু করলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবহন ও ডিজিটাল সংযোগসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে আরও বেশি যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
পূর্ববর্তী বাজেটগুলোতে বড় বড় অবকাঠামো ও মেগা প্রকল্প নেওয়া হলেও প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। অনেক ক্ষেত্রে ব্যয় বেড়েছে এবং বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে মূলধনের কার্যকারিতাও কমে গেছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য এবার সরকারি ক্রয়ের স্বচ্ছতা, প্রকল্প মূল্যায়ন এবং নিবিড় পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন কাঠামোকে শক্তিশালী করাকে প্রধান নীতিগত অগ্রাধিকার হিসেবে রাখা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মোট বিনিয়োগের বড় অংশ আসবে বেসরকারি খাত থেকে, যা মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২২ শতাংশে স্থির রয়েছে। লক্ষ্য পূরণে সরকারের নিজস্ব বিনিয়োগও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে—বর্তমান ৬ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ১৫ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত করার প্রক্ষেপণ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে শুধু কর সুবিধা যথেষ্ট নয়। জ্বালানি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা, উচ্চ সুদের হার, নীতিগত স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, ভূমি প্রাপ্তি, বন্দর দক্ষতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি বিনিয়োগ মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২২-২৩ শতাংশে আটকে আছে। এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে বাস্তব সংস্কার, সুশাসন ও নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে।

