জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা।
এ ছাড়া একই সভায় মোট ৫টি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। সব মিলিয়ে এসব প্রকল্পের মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ হাজার ৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি কোষাগার থেকে ব্যয় হবে ৪ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা এবং বিদেশি ঋণ হিসেবে আসবে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিসভার সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সভা শেষে শেরেবাংলা নগরের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এনইসি সম্মেলন কক্ষে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি এসব তথ্য জানান।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা ও অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। সভায় পরিকল্পনা সচিব এস এম শাকিল আখতারসহ অন্যান্য সচিবরা উপস্থিত ছিলেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী জানান, অতীতে প্রকল্প গ্রহণে অনিয়ম, অপচয় ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে। এ কারণে বর্তমান সরকার পূর্বের কাঠামো থেকে সরে এসেছে। তিনি বলেন, সব মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করা হচ্ছে এবং প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে একটি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হবে, যেখানে প্রতিটি প্রকল্পের অগ্রগতি জানা যাবে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে প্রতি তিন মাসে প্রকল্প অগ্রগতির প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হবে। দীর্ঘসূত্রতার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেসব প্রকল্পের কাজ ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে, সেগুলো দ্রুত শেষ করা হবে। ৩০ শতাংশের নিচে থাকা প্রকল্পগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগকে এ বিষয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অনেক প্রকল্পে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এটি বর্তমান সরকারের পঞ্চম একনেক সভা। সভায় বিনিয়োগ বাড়াতে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর সঙ্গে বর্জ্য শোধনাগার, সৌর প্যানেল ও পানি শোধনাগার সংযুক্ত করার নির্দেশ দেন।
প্রকল্পের আওতায় সোয়া এক কিলোমিটার জেটি সংযোগ সড়ক এবং এক কিলোমিটারের বেশি লিংক রোড নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সংযোগের জন্য প্রায় দুই কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন করা হবে। বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে এসব অবকাঠামো উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ আসবে এবং প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রকল্পের কাজ শুরু হবে ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে এবং শেষ হবে ২০৩১ সালের ডিসেম্বরে। এতে সরকারি কোষাগার থেকে ব্যয় হবে ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা এবং বিদেশি ঋণ ধরা হয়েছে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা।
জানা গেছে, ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের সময় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের বিষয়টি প্রথম আলোচনায় আসে। ওই সময় দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়। তবে নানা জটিলতায় প্রকল্পটি দীর্ঘদিন আটকে ছিল।
২০১৬ সালে ভূমি অধিগ্রহণ করা হলেও পরবর্তী সময়ে চূড়ান্ত বাস্তবায়ন এগোয়নি। পরে ২০২২ সালে চীনা সরকারের পক্ষ থেকে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে নতুন ডেভেলপার হিসেবে নির্বাচন করা হয়। তবে সরকারি ক্রয়নীতি অনুযায়ী একই প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্যতা যাচাই ও ডেভেলপার—দুই ভূমিকায় কাজ করতে না পারায় জটিলতা তৈরি হয় এবং প্রকল্পটি স্থবির হয়ে পড়ে।
পরবর্তীতে প্রকল্পটি আবার আলোচনায় আসে এবং গত একনেক সভায় অনুমোদনের তালিকায় থাকলেও সময় স্বল্পতায় তা অনুমোদন হয়নি। অবশেষে গতকাল প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। জানা গেছে, চলতি মাসের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। সেখানে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এ কারণে আগেই প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে সভায় ফেনী জেলার মুহুরী–কহুয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়) অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা। প্রকল্পটি ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে ২০৩১ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে।
এ ছাড়া করতোয়া নদীব্যবস্থা উন্নয়ন এবং কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার তালবাড়িয়া ও কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের কোমরকান্দি এলাকা পদ্মা নদীর ভাঙন থেকে রক্ষার (প্রথম সংশোধিত) প্রকল্প অনুমোদন পায়। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৯৪ কোটি টাকা। সভায় আরও অনুমোদন দেওয়া হয় ১০০টি উপজেলায় একটি করে কারিগরি স্কুল ও কলেজ স্থাপন (তৃতীয় সংশোধিত) প্রকল্প।

