ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করতে আগ্রহীদের জন্য নতুন শর্ত যুক্ত করতে যাচ্ছে সরকার। প্রস্তাবিত বাজেটে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীদের বার্ষিক আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র (পিএসআর) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ফলে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দেখাতে না পারলে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়া যাবে না।
এতদিন জাতীয় সংসদ, সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিতে আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র প্রয়োজন হতো। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদও সেই তালিকায় যুক্ত হবে।
সরকার শিগগিরই স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, চলতি বছরের বর্ষা মৌসুম শেষ হওয়ার পর সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে সারা দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য দেন।
মন্ত্রী আরও বলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
জমি ও ফ্ল্যাটের বণ্টন এবং নামজারিতেও নতুন শর্ত:
প্রস্তাবিত বাজেটে আয়কর রিটার্নের প্রমাণপত্র ব্যবহারের ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। বর্তমানে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকায় জমি, ভবন বা অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি, লিজ, হস্তান্তর, বায়নানামা কিংবা আমমোক্তারনামা নিবন্ধনের ক্ষেত্রে এ প্রমাণপত্র প্রয়োজন হয়।
নতুন বিধান অনুযায়ী, এখন থেকে এসব এলাকায় জমি, ভবন ও ফ্ল্যাটের বণ্টন এবং নামজারির ক্ষেত্রেও রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র দেখাতে হবে। এ ছাড়া নিবাসী করদাতা কোনো কোম্পানির পরিচালক বা স্পনসর শেয়ারহোল্ডার হতে গেলেও আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। তবে অনিবাসী পরিচালক ও স্পনসর শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষেত্রে এই শর্ত প্রযোজ্য হবে না।
করদাতাদের রিটার্ন দাখিলে উৎসাহিত করা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে কর-অনুগতিকে আরও শক্তভাবে যুক্ত করার লক্ষ্যেই এসব পরিবর্তনের প্রস্তাব আনা হয়েছে।
৩৯টি সেবা পেতে বাধ্যতামূলক রিটার্নের প্রমাণপত্র:
বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ৩৯ ধরনের সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে বার্ষিক আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র দেখানো বাধ্যতামূলক। নির্ধারিত এসব সেবা নিতে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ উপস্থাপন করতে না পারলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সেবা পাবে না। এমনকি নিয়ম অমান্য করে সেবা প্রদান করলে দায়ী কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও রয়েছে।
কর-অনুগতি নিশ্চিত করতে গত কয়েক বছরে ধাপে ধাপে বিভিন্ন সেবার সঙ্গে রিটার্ন জমার শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে মোট ৩৯টি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে এই বিধান কার্যকর রয়েছে। নিচে রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র প্রয়োজন হয় এমন গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলোর তালিকা তুলে ধরা হলো।
১. ২০ লাখ টাকার বেশি ঋণ গ্রহণে;
২. নিবাসী করদাতা কোম্পানির পরিচালক বা স্পনসর শেয়ারহোল্ডার হতে হলে;
৩. আমদানি নিবন্ধন সনদ বা রপ্তানি নিবন্ধন সনদ গ্রহণ অথবা নবায়ন করতে;
৪. সিটি করপোরেশন বা পৌরসভা এলাকায় ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে;
৫. সাধারণ বিমার তালিকাভুক্ত সার্ভেয়ার লাইসেন্স নবায়ন করতে;
৬. সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকায় জমি, বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি বা লিজ বা হস্তান্তর, বণ্টন বা বায়নানামা বা আমমোক্তারনামা নিবন্ধন, মিউটেশন করতে;
৭. চিকিৎসক, দন্ত চিকিৎসক, আইনজীবী, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট, চার্টার্ড সেক্রেটারি, আইনজীবী ও কর আইনজীবী, একচুয়ারি, প্রকৌশলী, স্থপতি, সার্ভেয়ার হিসেবে কোনো স্বীকৃত পেশাজীবী সংস্থার সদস্যপদ নবায়ন করতে;
৮. মুসলিম ম্যারেজ অ্যান্ড ডিভোর্স (রেজিস্ট্রেশন) অ্যাক্ট, ১৯৪৭–এর অধীন নিকাহ রেজিস্ট্রার, হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন, ২০১২–এর অধীন হিন্দু বিবাহ নিবন্ধক ও স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট ১৮৭২–এর অধীন রেজিস্ট্রার হিসেবে লাইসেন্স প্রাপ্তি অথবা নবায়ন করতে;
৯. ট্রেড বডি বা কোনো বাণিজ্যিক সংগঠনের সদস্যপদ প্রাপ্তি অথবা নবায়ন করতে;
১০. স্ট্যাম্প, কোর্ট ফি ও কার্টিজ পেপারের ভেন্ডার বা দলিল লেখক হিসেবে লাইসেন্স নবায়নে;
১১. ড্রাগ লাইসেন্স, ফায়ার লাইসেন্স, পরিবেশ ছাড়পত্র, বিএসটিআই লাইসেন্স, বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্স, কাস্টমস এজেন্ট লাইসেন্স, ফ্রেট ফরওয়ার্ডিং লাইসেন্স ও বায়িং হাউস নিবন্ধন গ্রহণ ও নবায়নে;
১২. যেকোনো এলাকায় গ্যাসের বাণিজ্যিক ও শিল্প সংযোগপ্রাপ্তি ও বহাল রাখতে;
১৩. সিটি করপোরেশন এলাকায় আবাসিক গ্যাস–সংযোগ প্রাপ্তিতে;
১৪. সিটি করপোরেশন বা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকায় বিদ্যুৎ–সংযোগ প্রাপ্তিতে;
১৫. লঞ্চ, স্টিমার, মাছ ধরার ট্রলার, কার্গো, কোস্টার, ডাম্ব-বার্জসহ যেকোনো প্রকারের ভাড়ায় চালিত নৌযানের সার্ভে সার্টিফিকেট গ্রহণ ও নবায়নে;
১৬. পরিবেশ অধিদপ্তর বা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ইট উৎপাদনের অনুমতি গ্রহণ ও নবায়নে;
১৭. সিটি করপোরেশন, জেলা সদর বা পৌরসভায় অবস্থিত ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শিশু বা পোষ্য ভর্তিতে;
১৮. কোম্পানির এজেন্সি বা ডিস্ট্রিবিউটরশিপ গ্রহণে ও নবায়নে;
১৯. আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স গ্রহণে ও নবায়নে;
২০. আমদানির উদ্দেশ্যে ঋণপত্র খোলায়;
২১. ১০ লাখের অধিক টাকার মেয়াদি আমানত খোলায় ও বহাল রাখতে;
২২. ১০ লাখের অধিক টাকার সঞ্চয়পত্র কেনায়;
২৩. ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন বা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণে;
২৪. ব্যবস্থাপনা বা প্রশাসনিক বা উৎপাদন কার্যক্রমের তত্ত্বাবধানকারী পদমর্যাদায় কর্মরত ব্যক্তির বেতন-ভাতাদি প্রাপ্তিতে;
২৫. দশম গ্রেড বা তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার সরকারি কর্মচারীর বেতন-ভাতাদি প্রাপ্তিতে;
২৬. স্বাভাবিক ব্যক্তি ছাড়া অন্য করদাতাদের ক্ষেত্রে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা মোবাইল ব্যাংকিং বা ইলেকট্রনিক উপায়ে টাকা স্থানান্তরের মাধ্যমে এবং মোবাইল ফোনের হিসাব রিচার্জের মাধ্যমে কমিশন, ফি বা অন্য কোনো অর্থপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে;
২৭. কোনো নিবাসী করদাতা কর্তৃক অ্যাডভাইজরি বা কনসালট্যান্সি সার্ভিস, ক্যাটারিং সার্ভিস, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সার্ভিস, জনবল সরবরাহ, নিরাপত্তাসেবা সরবরাহ বাবদ কোনো কোম্পানি হতে অর্থপ্রাপ্তিতে;
২৮. বিমা কোম্পানির এজেন্সি সার্টিফিকেট গ্রহণ ও নবায়নে;
২৯. দ্বিচক্র বা ত্রিচক্র মোটরযান ছাড়া অন্য মোটরযানের নিবন্ধন, মালিকানা পরিবর্তন বা ফিটনেস নবায়নকালে;
৩০. এনজিও–বিষয়ক ব্যুরোতে নিবন্ধিত এনজিও বা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি হতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার অনুকূলে বিদেশি অনুদানের অর্থ ছাড় করতে;
৩১. ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ই-কমার্স ব্যবসার ক্ষেত্রে লাইসেন্সিং অথরিটির কাছ থেকে লাইসেন্স নবায়নে;
৩২. কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ এবং সোসাইটিস রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট, ১৮৬০–এর অধীন নিবন্ধিত কোনো ক্লাবের সদস্যপদ গ্রহণ ও নবায়নে;
৩৩. কোনো নিবাসী করদাতা কর্তৃক পণ্য সরবরাহ, চুক্তি সম্পাদন বা সেবা সরবরাহের উদ্দেশ্যে দরপত্র দলিলাদি দাখিলকালে;
৩৪. পণ্য আমদানি বা রপ্তানির উদ্দেশ্যে বিল অব এন্ট্রি দাখিলকালে;
৩৫. রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ), রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ), গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা সরকার কর্তৃক গঠিত অনুরূপ কর্তৃপক্ষ অথবা সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার অন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমোদনের নিমিত্ত ভবন নির্মাণের নকশা দাখিলকালে;
৩৬. কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে সিটি করপোরেশন এলাকায় বাড়িভাড়া বা লিজ প্রদানকালে:
৩৭. আয়কর আইনে নির্দিষ্ট করা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে পণ্য বা সেবা সরবরাহকালে;
৩৮. হোটেল, রেস্টুরেন্ট, মোটেল, কমিউনিটি সেন্টার, কনভেনশন হল, হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারসমূহের লাইসেন্স গ্রহণ ও নবায়নে;
৩৯. সামাজিক অনুষ্ঠান, করপোরেট প্রোগ্রাম, ওয়ার্কশপ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, প্রশিক্ষণসহ সমজাতীয় যেকোনো অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত কমিউনিটি সেন্টার, কনভেনশন হল বা সমজাতীয় কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে ভাড়া বা অন্য যেকোনো সেবা গ্রহণকালে।

