দীর্ঘদিন ধরে স্থবির অবস্থায় থাকা বগুড়া-সিরাজগঞ্জ নতুন ডুয়েলগেজ রেললাইন প্রকল্প আবারও গতিশীল হতে শুরু করেছে। সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এই প্রকল্পের সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) ইতোমধ্যে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী প্রকল্পটির ব্যয় বেড়ে প্রায় ১২ হাজার ৫০০ কোটিরও বেশি টাকায় পৌঁছেছে, যা ২০১৮ সালে অনুমোদনের সময় নির্ধারিত ব্যয়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়। তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং ভারতীয় ঋণের মাধ্যমে অর্থায়নের পরিকল্পনা ছিল। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ভারতীয় অর্থায়ন বাতিল করলে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বর্তমানে প্রকল্পটির অর্থায়নে আগ্রহ দেখিয়েছে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)। ফলে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, জমির দাম বৃদ্ধি, ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়া এবং প্রকল্পের পরিধি সম্প্রসারণের কারণে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সর্বশেষ সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় নতুন কিছু অবকাঠামো যুক্ত করার সুপারিশও করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রেল ফ্লাইওভার এবং অন্যান্য সম্প্রসারণমূলক কাজ।
আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। তবে সংশোধিত ডিপিপিতে মেয়াদ আরও চার বছর বাড়িয়ে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। গত ১৪ জুন প্রকল্প দপ্তর সংশোধিত ডিপিপি রেলপথ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে এটি পরিকল্পনা কমিশনে যাবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, সবকিছু ঠিক থাকলে এক মাসের মধ্যেই ডিপিপি একনেক সভায় উপস্থাপন করা হতে পারে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রকল্পের নকশা ও রেলপথের অ্যালাইনমেন্ট চূড়ান্ত করা হয়েছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, জনস্বার্থ ও প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে যেকোনো পরিবর্তনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে। শুরুতে ৯৬০ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য ১ হাজার ৯২১ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় জমির পরিমাণ কিছুটা কমে ৯০১ দশমিক ৭৭ একরে নামলেও জমির বাজারমূল্য বেড়ে যাওয়ায় ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ২৪৪ কোটি ১৬ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। শুধু এই খাতেই অতিরিক্ত ব্যয় যোগ হয়েছে ৩২৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা। প্রয়োজনীয় অর্থ ইতোমধ্যে বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
সংশোধিত পরিকল্পনা অনুযায়ী বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ৭৬ কিলোমিটার নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটি বগুড়া সদর, কাহালু, শাজাহানপুর, শেরপুর, রায়গঞ্জ, কামারখন্দ এবং সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলায় বাস্তবায়িত হবে।
বর্তমানে এই রুটে ট্রেন চলাচলের জন্য প্রায় ১৯০ কিলোমিটার ঘুরপথ ব্যবহার করতে হয়। সান্তাহার, নাটোর ও ঈশ্বরদী হয়ে চলাচল করায় সময় ও পরিচালন ব্যয় দুটোই বেশি হয়। নতুন রেললাইন চালু হলে দূরত্ব কমে যাবে ১১৪ কিলোমিটার এবং যাত্রার সময় সাশ্রয় হবে প্রায় তিন ঘণ্টা। এতে রাজধানী ঢাকা ও উত্তরাঞ্চলের মধ্যে দ্রুত, নিরাপদ এবং সাশ্রয়ী রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পের আওতায় ৮৬ দশমিক ৫১ কিলোমিটার মূল রেললাইন এবং ৩৭ কিলোমিটার লুপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। করতোয়া ও ইছামতী নদীর ওপর দুটি বড় সেতুসহ মোট ১২১টি ছোট-বড় সেতু নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের ওপর একটি রেল ওভারপাস এবং ঢাকা-নাটোর মহাসড়কের ওপর একটি সড়ক ওভারপাস নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই রেলপথে মোট ১১টি স্টেশন থাকবে। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জ জংশন, কৃষ্ণদিয়া, রায়গঞ্জ, চান্দাইকোনা, সনকা, শেরপুর, আরিয়া বাজার ও রাণীরহাটে নতুন স্টেশন নির্মাণ করা হবে। অন্যদিকে বগুড়া, কাহালু ও সদানন্দপুর স্টেশন পুনর্নির্মাণ করা হবে। রাণীরহাট এলাকায় একটি ‘ওয়াই’ আকৃতির রেললাইনও নির্মিত হবে, যা বগুড়া ও কাহালু অভিমুখে পৃথক সংযোগ দেবে।
প্রকল্প পরিচালক মো. আবু জাফর মিঞা জানিয়েছেন, সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদনের পর দরপত্র প্রক্রিয়াসহ প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে মূল নির্মাণকাজ শুরু হতে আরও প্রায় নয় মাস সময় লাগতে পারে। তিনি বলেন, ২০১৮ সালের ব্যয় কাঠামোর সঙ্গে বর্তমান বাজার পরিস্থিতির বড় পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে নির্মাণসামগ্রী ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধি প্রকল্প ব্যয় বাড়ার অন্যতম কারণ।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সরকারের উচ্চপর্যায়ের আগ্রহের কারণে প্রকল্পটির প্রশাসনিক ও কারিগরি কার্যক্রমে নতুন গতি এসেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটেও প্রকল্পটিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং মো. হাদিউজ্জামান বলেন, এই রেললাইন অনেক আগেই নির্মাণ হওয়া উচিত ছিল। দীর্ঘসূত্রতার কারণে এখন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। তিনি মনে করেন, শুরু থেকেই কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে নির্ধারিত সময় ও ব্যয়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।

