মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সংকটের পর বিশ্বজুড়ে বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান আলোচ্যসূচির শীর্ষে উঠে এসেছে ‘বিদ্যুতায়ন’।
ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে বিদ্যুচ্চালিত প্রযুক্তিতে রূপান্তর করা আরও জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন ৮০ শতাংশ করপোরেট নির্বাহী। সম্প্রতি এক বৈশ্বিক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিনান্সিয়াল টাইমস।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে বিশ্বজুড়ে বহু প্রতিষ্ঠান চাপের মুখে পড়েছে। ফলে কীভাবে কম খরচে এবং লাভজনকভাবে কার্যক্রমকে বিদ্যুচ্চালিত ব্যবস্থায় রূপান্তর করা যায়, তা নিয়ে ব্যবসায়ীরা এখন গভীরভাবে ভাবছেন।
পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে এবং স্বাধীন গবেষণা সংস্থা পাবলিক ফার্স্টের মাধ্যমে এ জরিপটি পরিচালিত হয়। এতে অংশ নেন বিশ্বের ১৮টি দেশের প্রায় ২ হাজার শীর্ষ করপোরেট নির্বাহী। জরিপে অংশ নেওয়া ৯১ শতাংশ নির্বাহী জানান, জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত যন্ত্রপাতির পরিবর্তে বিদ্যুচ্চালিত চুল্লি, তাপ পাম্প এবং বিদ্যুচ্চালিত যানবাহনের মতো প্রযুক্তি ব্যবহারে তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।
সুইজারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসভিত্তিক বহুজাতিক রাসায়নিক কোম্পানি ডিএসএম ফার্মেনিখের প্রধান নির্বাহী দিমিত্রি ডি ভ্রিজ জানান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিদ্যুতায়নের বিস্তার তাদের প্রতিষ্ঠানের জ্বালানি নিরাপত্তা ইতোমধ্যে উন্নত করেছে। পাশাপাশি ব্যবসার ব্যয়ও আরও পূর্বানুমানযোগ্য হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান ব্যবসায়িক পরিবেশ কাঠামোগতভাবেই অনেক বেশি অস্থির। এমন পরিস্থিতিতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কোম্পানি ও দেশের অর্থনীতিকে বারবার বড় ধাক্কার মুখে ফেলছে। একই ধরনের অবস্থান নিয়েছে ইউরোপের শীর্ষ ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রশে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৯ সালের মধ্যে তাদের মোট যানবাহনের ৮৫ শতাংশ বিদ্যুচ্চালিত গাড়িতে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
রশের প্রধান নির্বাহী থমাস শিনেকার বলেন, বিদ্যুতায়ন ব্যবসার অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ায় এবং দীর্ঘমেয়াদে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জার্মানির মিউনিখভিত্তিক রাসায়নিক প্রতিষ্ঠান ওয়াকার কেমির প্রধান নির্বাহী জানান, তাদের কারখানায় ব্যবহৃত মোট জ্বালানির ৬০ শতাংশেরও বেশি ইতোমধ্যে বিদ্যুৎভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করা হয়েছে।
জরিপে অংশ নেওয়া তিন-চতুর্থাংশ ব্যবসায়ী জানান, তারা ২০৩০ সালের মধ্যে অধিকাংশ জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনা করছেন। তবে এই রূপান্তরের পথে বড় বাধা হিসেবে উঠে এসেছে সরকারি নীতির অনিশ্চয়তা।
পরিবেশবিদদের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা কমানোর প্রধান উপায় হলো বিদ্যুতায়ন। তাদের মতে, পরিচ্ছন্ন উৎস থেকে কম খরচে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হলেও বড় পরিসরে রূপান্তরের জন্য বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ব্যাপক সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে বৈশ্বিক বিদ্যুৎ ব্যবহার সামগ্রিক জ্বালানি চাহিদার তুলনায় অন্তত ২ দশমিক ৫ গুণ দ্রুত বাড়বে। ভারী শিল্প, বিদ্যুচ্চালিত যানবাহন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ এবং বড় ডেটা কেন্দ্রগুলোর কারণে এই চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জরিপে আরও দেখা গেছে, নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, ফিলিপাইন, কলম্বিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ উন্নয়নশীল দেশগুলোর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিদ্যুতায়নে সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই তালিকায় রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, কেনিয়া, পোল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশও।

