অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো না থাকলেও রাজধানীর বেইলি রোডে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের জন্য একটি বিলাসবহুল মসজিদ নির্মাণের প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এতে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে কাজ শুরু করে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্মাণ শেষ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। ব্যয় ধরা হয় ১৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা।
প্রকল্পটি যাচাই করতে সম্প্রতি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রস্তাবিত চারতলা ভবনে ১২০ টন ক্ষমতার ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সভা শেষে প্রস্তাবিত স্থানে সরাসরি নির্মাণ না করে পুরো এলাকার মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করে নতুন করে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব প্রস্তুতের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর তা আবার পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে নতুন করে সভা হবে। এ অবস্থায় ‘বেইলি রোডস্থ মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট মসজিদ নির্মাণ’ প্রকল্পটি আপাতত ঝুলে গেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে গণপূর্ত অধিদপ্তর।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও আবাসিক এলাকার গুরুত্ব বিবেচনায় রাজধানীর মিন্টো রোড ও বেইলি রোড সংলগ্ন মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট এলাকায় একটি আধুনিক চারতলা মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্থাপত্য অধিদপ্তর এর নকশা চূড়ান্ত করে এবং প্রাথমিকভাবে মাটি পরীক্ষার কাজও সম্পন্ন করে। অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় ১৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা সম্পূর্ণ সরকারি অর্থে বাস্তবায়নের প্রস্তাব ছিল।
বর্তমানে মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট এলাকায় একটি অস্থায়ী টিনশেড মসজিদ রয়েছে। সেখানে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা, সচিব, বিচারপতি ও সমমর্যাদার কর্মকর্তারা নামাজ আদায় করেন। তবে অনেক সময় স্থান সংকুলান হয় না। পাশাপাশি গরম, বর্ষা ও শীত মৌসুমে টিনশেড কাঠামোর কারণে নানা ভোগান্তি তৈরি হয়। বৃষ্টি হলে ভেতরে পানি পড়ে এবং গরমে অবস্থান করা কষ্টকর হয়ে ওঠে। এ কারণে পুরোনো কাঠামো সরিয়ে স্থায়ী ও আধুনিক মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
প্রস্তাবিত নকশা অনুযায়ী চারতলা মসজিদ ভবনে সুউচ্চ মিনার, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, আধুনিক শব্দ ব্যবস্থা, শব্দ নিরোধক ব্যবস্থা, উন্নত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। একই সঙ্গে আরবি ক্যালিগ্রাফি ও নান্দনিক নকশার মাধ্যমে সৌন্দর্য বৃদ্ধির বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
প্রস্তাবিত ভবনের মোট ১ হাজার ৮৩০ বর্গমিটার নির্মাণ ও মিনার বাবদ ব্যয় ধরা হয় ১০ কোটি ২৮ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ৫৪ শতাংশ। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা, ভূগর্ভস্থ জলাধারে ৩৫ লাখ, শব্দ ব্যবস্থায় ১২ লাখ, সিসিটিভি ব্যবস্থায় ১০ লাখ, দুটি লিফটে ৯৪ লাখ, বিশেষ আলোকসজ্জায় ৩৫ লাখ, ১০ কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ১৫ লাখ এবং সার্ভিস কেবলে ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রাখা হয়। অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যবর্ধন, অজুখানা, বিদ্যুৎ ও অগ্নিনির্বাপণসহ অন্যান্য খাতে ব্যয়ের পরিকল্পনাও ছিল। জমিটি গণপূর্ত অধিদপ্তরের মালিকানাধীন হওয়ায় ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ অতিরিক্ত ব্যয় লাগবে না বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়।
এলাকার মুসল্লিরা জানান, বর্তমানে অনেকেই নামাজের জন্য পাশের সার্কিট হাউস মসজিদে যান, কারণ স্থান সংকুলান হয় না। অস্থায়ী টিনশেড মসজিদে বৃষ্টি হলে পানি পড়ে এবং গরমে ভেতরে থাকা কঠিন হয়ে যায়। তারা মনে করেন, আধুনিক ও স্থায়ী মসজিদ হলে সবার জন্য সুবিধা হবে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, প্রকল্পটি প্রয়োজন ও বাস্তবতা বিবেচনায় তৈরি করা হয়েছে। এখানে নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রজাতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য উপযুক্ত ইবাদতের পরিবেশ প্রয়োজন।
প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় পরিকল্পনা কমিশনের এক সদস্য জানান, মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্টের পাশে নতুন আরেকটি আবাসিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা থাকায় পুরো এলাকার মাস্টারপ্ল্যান করে মসজিদ নির্মাণ করলে তা আরও কার্যকর হবে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বাস্তবতা অনুযায়ী নকশা ও প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছিল। পরিকল্পনা কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংশোধন করা হবে এবং নতুন স্থান নির্ধারণের পর প্রকল্প এগোবে।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া বলেন, নতুন মাস্টারপ্ল্যানের আলোকে বড় পরিসরে মসজিদ নির্মাণ করতে হবে। সেই অনুযায়ী নতুন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পাঠালে আবার মূল্যায়ন কমিটির সভা হবে এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের পথ খুলবে।

