২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে আমদানিকৃত নির্দিষ্ট কিছু ক্যাটাগরির টায়ারের ওপর প্রস্তাবিত ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক পরিবহন ব্যয় বাড়াতে পারে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ তীব্র করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ব্যবসায়ী, পরিবহন মালিক ও অর্থনীতিবিদ।
কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, হালকা বাণিজ্যিক ট্রাক ও বাসের টায়ারের ক্ষেত্রে শুল্ক সবচেয়ে বেশি বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। এতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসব টায়ারের ওপর মোট করভার ৬৪.২৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯৬.১০ শতাংশে পৌঁছাবে। আমদানিকারকদের হিসাব বলছে, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে পিকআপ ভ্যান ও অন্যান্য যানবাহনের ব্যবহৃত টায়ারের দাম সর্বোচ্চ ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্দিষ্ট কিছু ক্যাটাগরির টায়ারের ওপর সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কসহ কর কাঠামোর পরিবর্তনের ফলে পরিবহন, কৃষি, নির্মাণ ও শিল্প খাতে ব্যবহৃত টায়ারের দাম একসঙ্গে বেড়ে যাবে। চট্টগ্রাম টায়ার টিউব ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউটর্স গ্রুপের সভাপতি আলহাজ্ব মাইন উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, অর্থনীতির চাকা নির্ভর করে পরিবহনের ওপর, আর পরিবহনের চাকা টায়ারের ওপর। তাই হঠাৎ টায়ারের দাম বাড়লে তার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতেই পড়বে।
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান মার্কএনটেল অ্যাডভাইজরস-এর তথ্যমতে, ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের টায়ার বাজারের আকার ২৩ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। এর প্রায় তিন-চতুর্থাংশই আসে আফটারমার্কেট বা খুচরা বাজার থেকে। দেশে বার্ষিক টায়ার চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানিনির্ভর।
আমদানিকারকদের মতে, এই উচ্চ নির্ভরশীলতার কারণেই শুল্ক পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি পরিবহন, কৃষি, নির্মাণ ও শিল্প খাতে ভোক্তাদের ওপর পড়বে। দেশে কিছু যাত্রীবাহী গাড়ির টায়ার উৎপাদন হলেও ভারী যানবাহন ও বিশেষায়িত টায়ারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো ব্যাপকভাবে আমদানিনির্ভর। অন্যদিকে দেশীয় টায়ার উৎপাদনকারীরা প্রস্তাবিত শুল্ক বৃদ্ধিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, এটি দেশীয় উৎপাদনকে সহায়তা করবে এবং নতুন বিনিয়োগ বাড়াবে।
মেঘনা গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান মেঘনা ইনোভা রাবার কোম্পানি লিমিটেডের সেলস বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শুল্ক বৃদ্ধির আওতায় থাকা ক্যাটাগরিগুলোর চাহিদা পূরণে দেশীয় উৎপাদনকারীদের সক্ষমতা রয়েছে। তিনি বলেন, এসব খাতে উৎপাদন বাড়িয়ে চাহিদা মেটানো সম্ভব।
বর্তমানে দেশে সাতটি টায়ার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। দেশীয় উৎপাদনকারীরা মনে করছেন, আমদানির ওপর কর বৃদ্ধি স্থানীয় শিল্পের বিকাশকে ত্বরান্বিত করবে। কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে যাত্রীবাহী গাড়ির রেডিয়াল টায়ারের মোট করভার ৯৩.১৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯৬.১০ শতাংশ হবে। ট্রাক্টর টায়ারের ক্ষেত্রে করের হার ১৭.৮৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৩.৬৩ শতাংশ হবে। ভারী শিল্প যন্ত্রপাতির টায়ারের ক্ষেত্রে তা ৬১.৮৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬৪.২৫ শতাংশে পৌঁছাবে। তবে বাণিজ্যিক ট্রাক ও বাসের কিছু ক্যাটাগরির ক্ষেত্রে কর ৪৫.৮৮ শতাংশে অপরিবর্তিত থাকবে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, টায়ার কোনো বিলাসপণ্য নয়, বরং উৎপাদন ও পরিবহনের মৌলিক উপাদান। তাই এ খাতে কর বৃদ্ধি অনেক বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, এই সিদ্ধান্তে কয়েকটি ক্যাটাগরির টায়ারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। যাত্রীবাহী গাড়ির টায়ারে প্রতি পিসে প্রায় ৭০০ টাকা, ট্রাক্টরের টায়ারে প্রায় ৫ হাজার টাকা এবং ভারী শিল্প যন্ত্রপাতির টায়ারে প্রায় ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, একটি ট্রাকে আটটি টায়ার থাকলে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৩২ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা। এই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত পরিবহন ভাড়ায় যুক্ত হবে। তিনি বলেন, পরিবহন ব্যয় বাড়লে পণ্যের দামও বেড়ে যাবে, যার মধ্যে শাকসবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যও রয়েছে।
তিনি এই প্রভাবকে বহুমাত্রিক অভিঘাত হিসেবে বর্ণনা করেন। তার মতে, সরবরাহ শৃঙ্খলের এক ধাপে খরচ বাড়লে তা ধীরে ধীরে পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, যে কর কাঠামোর কারণে টায়ারের দাম ৩০ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে, তার যৌক্তিকতা নিয়ে। একই সঙ্গে তিনি মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেন। পরিবহন মালিক ও আমদানিকারকরা এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ কাভার্ড ভ্যান, ট্রাক, প্রাইম মুভার গুডস ট্রান্সপোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব চৌধুরী জাফর আহমদ বলেন, পরিবহন খাত এমনিতেই বাড়তি খরচের চাপে রয়েছে। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয় ইতোমধ্যেই বেড়েছে। এখন টায়ারের দাম বাড়লে সেই চাপ আরও তীব্র হবে এবং তা মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলবে।
সংগঠনটির সহসভাপতি মোহাম্মদ মুক্তার হোসেন বলেন, আমদানিকারকরা প্রকৃত আমদানি মূল্যের তুলনায় বেশি নির্ধারিত মূল্য ধরে শুল্ক পরিশোধ করছেন। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কেজিপ্রতি টায়ার আমদানির প্রকৃত মূল্য ২.৫ ডলার হলেও হিসাবের জন্য ৩ ডলার ধরা হয়। এতে একটি টায়ারের ওপর বাড়তি শুল্ক দিতে হয়। তিনি আরও বলেন, প্রস্তাবিত ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক কার্যকর হলে একটি টায়ারের শুল্ক প্রায় ৭ হাজার টাকায় পৌঁছাবে।
সব মিলিয়ে অংশীজনরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে আমদানিকারক, পরিবহন মালিক ও দেশীয় উৎপাদনকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রস্তাবিত কর কাঠামো পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।

