আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থনৈতিক বাস্তবতা, সরকারের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ ও গবেষকেরা। তাঁদের মতে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আদায়, বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ এবং বাজেট ঘাটতি ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যমাত্রা বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এই পর্যবেক্ষণ উঠে আসে রাজধানীতে গত ১৭ জুন অনুষ্ঠিত “উন্নয়ন ও রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট” শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে। এটি আয়োজন করে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম। সহযোগী আয়োজক ছিল ওয়ান ইনিশিয়েটিভ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টের সহকারী অধ্যাপক জুবায়ের আহমেদ। তিনি বলেন, বর্তমান অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ থাকলেও আগামী বাজেটে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি আরও বলেন, রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮২ শতাংশই তৈরি পোশাক খাতনির্ভর, ফলে অর্থনীতির বহুমুখীকরণ এখনো কঠিন অবস্থায় রয়েছে। অন্যদিকে বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ সাধারণত মোট দেশজ উৎপাদনের শূন্য দশমিক ৪ থেকে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে থাকলেও বাজেটে তা ২ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যকে তিনি অবাস্তব বলে মন্তব্য করেন।
মুদ্রাস্ফীতি ৮ থেকে ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য এবং প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর পরিকল্পনা একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা পরস্পরবিরোধী বলেও তিনি মন্তব্য করেন। পাশাপাশি ব্যাংক খাতে ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বৃদ্ধির ফলে বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের লক্ষ্য ও বাস্তব আদায়ের মধ্যে ফারাক থাকলেও এবারও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত হয়নি।
বাজেট কাঠামো নিয়ে তিনি বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির কিছু খাতে বরাদ্দ কমানো হলেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিতে ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং সরকারি ব্যয়ে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা ও অর্থনীতি অনুষদের ডিন এ কে এম ওয়ারেসুল করিম বলেন, বাংলাদেশের বাজেট সময়ের সঙ্গে ১২০ গুণের বেশি বড় হয়েছে, তবে এটি সবসময় দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক সক্ষমতা প্রতিফলিত করে না।
তিনি বলেন, বড় বাজেট মানেই ভালো বাজেট নয়। এতে ঋণ, কর ও অর্থ সরবরাহের ওপর চাপ বাড়ে। বাজেট ঘাটতি পূরণে এসব উপাদান ব্যবহার করতে হয়। তিনি আরও বলেন, বাজেটের বড় একটি অংশ প্রশাসনিক ব্যয়ে ব্যয় হয়, ফলে সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন ব্যয়ের কার্যকারিতা কমে যায়। তিনি দাবি করেন, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর মিলিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর প্রায় ৪৫ থেকে ৬০ শতাংশ করভার পড়ে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, প্রতিরক্ষা খাতে ৪০ থেকে ৪২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও এর বড় অংশ বেতন ও প্রশাসনিক ব্যয়ে চলে যায়। ফলে আধুনিক সরঞ্জাম কেনার সুযোগ সীমিত হয়ে সক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হয়।
তিনি কৃষি খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, জাতীয় বাজেটের মাত্র ৫ থেকে ৬ শতাংশ কৃষিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এছাড়া কৃষি ভর্তুকির বড় অংশ মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে চলে যায় বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
ব্যক্তিগত আয়কর অব্যাহতি সীমা বাড়ানোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় সাধারণ মানুষের স্বস্তি সীমিত থাকবে, বরং কর কাঠামোর পরিবর্তনে করদাতাদের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, বড় বাজেট ঘাটতির কারণে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়বে, যা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বলেন, রাজস্ব আদায়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও কর্মসংস্থান পরিকল্পনার ঘাটতিও তিনি উল্লেখ করেন।
এবি পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, বাজেটের আকারের চেয়ে এর বাস্তবায়ন ও জবাবদিহি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। স্বচ্ছ মূল্যায়নের অভাবে দুর্নীতি ও অপচয়ের সুযোগ তৈরি হয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

