দেশের চা শিল্পে নতুন করে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে চা উৎপাদনে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি এসেছে। অনুকূল আবহাওয়া, নিলাম বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং চাষিদের বাড়তি আগ্রহের কারণে জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে চা উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে দেশে মোট ৯০ লাখ ৭৩ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে উৎপাদন ছিল ৩৯ লাখ ৪৬ হাজার কেজি। সেই হিসাবে উৎপাদন বেড়েছে ৫১ লাখ ২৭ হাজার কেজি, যা শতাংশের হিসাবে ১৩০ শতাংশ বৃদ্ধি।
চা বোর্ড ২০২৬ সালের জন্য ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজি উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। যদিও গত দুই বছর প্রত্যাশিত উৎপাদন অর্জিত হয়নি। সে সময় নিলাম বাজারে চায়ের দাম অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয়ের চেয়েও কম ছিল। ফলে উৎপাদন বাড়িয়ে ক্ষতির ঝুঁকি নিতে আগ্রহী ছিলেন না অনেক বাগান মালিক। তবে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে পূর্ববর্তী বছরে নির্ধারিত ফ্লোর প্রাইস সংশোধন করা হলে বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। নিলামে বিক্রি বাড়তে শুরু করে এবং বছরের শেষে গড় মূল্যও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাব চলতি বছরের উৎপাদনেও পড়েছে।
শুধু এপ্রিল মাসেই দেশে ৫৯ লাখ ১৮ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। ২০২৫ সালের একই মাসের তুলনায় এটি ৩৬ লাখ ৪৬ হাজার কেজি বেশি। সংশ্লিষ্টদের মতে, মার্চের শেষভাগ থেকে এপ্রিলজুড়ে চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে অনিয়মিত হলেও পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত এবং অনুকূল আবহাওয়া বিরাজ করায় উৎপাদন দ্রুত বেড়েছে। ফলে বছর শেষে সামগ্রিক উৎপাদন পরিস্থিতি আরও ইতিবাচক হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৫ লাখ ৭৩ হাজার কেজি, ফেব্রুয়ারিতে ২৪ হাজার কেজি এবং মার্চে ২৫ লাখ ৫৮ হাজার কেজি চা উৎপাদন হয়েছে। অন্যদিকে ২০২৫ সালের একই সময়ে জানুয়ারিতে উৎপাদন ছিল ৩ লাখ ৯ হাজার কেজি, ফেব্রুয়ারিতে ৩০ হাজার কেজি এবং মার্চে ১৩ লাখ ৩৫ হাজার কেজি।
বাংলাদেশের আবহাওয়াগত বাস্তবতায় সাধারণত মে মাস থেকে চা উৎপাদনের গতি বাড়তে শুরু করে। জুলাই থেকে প্রতি মাসে প্রায় এক থেকে দেড় কোটি কেজি পর্যন্ত উৎপাদন হয়। তবে বৃষ্টিপাত কমে গেলে নভেম্বর থেকে উৎপাদন হ্রাস পেতে থাকে। আর পরবর্তী বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাগান পরিচর্যার জন্য উৎপাদন প্রায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে।
উদালিয়া চা বাগানের কো-অর্ডিনেটর মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কয়েক বছর ধরে দেশের চা উৎপাদন ঊর্ধ্বমুখী ছিল। কিন্তু বিরূপ আবহাওয়া, দেশীয় বাজারে চাহিদার স্থবিরতা এবং কম দামের কারণে অনেক বাগান উৎপাদন বাড়িয়ে ক্ষতি বাড়াতে চায়নি। বর্তমানে নিলাম বাজারে ভালো মূল্য পাওয়ায় অধিকাংশ বাগান উৎপাদন বৃদ্ধিতে মনোযোগী হয়েছে, যা দেশের চা খাতের জন্য ইতিবাচক বার্তা।
তিনি আরও বলেন, নিলামে ভালো দাম অব্যাহত থাকলে বাগানগুলোর আয় বাড়বে। ফলে চা বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী বাগান সম্প্রসারণেও উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করতে পারবেন। এ জন্য নিয়মিত পরিচর্যার পাশাপাশি বিনিয়োগ সুবিধা বাড়াতে সরকারের আরও উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
উৎপাদনের পাশাপাশি নিলাম বাজারেও চায়ের বিক্রি ও মূল্য ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। চলতি নিলামবর্ষে ২৭ এপ্রিল শুরু হওয়া চট্টগ্রামের প্রথম নিলামে প্রতি কেজি চা গড়ে ২৭৪ টাকায় বিক্রি হয়েছে। একই সময়ে শ্রীমঙ্গলে গড় মূল্য ছিল ২৬৭ টাকা এবং পঞ্চগড়ে ২৩২ টাকা। দেশের মোট চা বাণিজ্যের প্রায় ৯৮ শতাংশ চট্টগ্রাম নিলামের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ায় এই বাজারের গতিপ্রকৃতি পুরো খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
নিলাম বাজারের তথ্য অনুযায়ী, ৮ জুন অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম নিলামে ২৬ লাখ ৬০ হাজার ৭৫০ কেজি চা বিক্রির জন্য তোলা হয়। এর মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি চা প্রতি কেজি ২৭৩ টাকা দরে বিক্রি হয়। মৌসুমের প্রথম পাঁচটি নিলামেই মোট ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৯৯৯ কেজি চা বিক্রি হয়েছে। এসব চায়ের গড় বিক্রয়মূল্য ছিল প্রতি কেজি ২৭৩ টাকা ৩১ পয়সা। অন্যদিকে শ্রীমঙ্গলের প্রথম চারটি নিলামে ১ লাখ ৩১ হাজার ৩৩২ কেজি চা গড়ে ২৫৪ টাকা ৪৫ পয়সা দরে বিক্রি হয়েছে। পঞ্চগড়ের প্রথম তিনটি নিলামে ৯২ হাজার ২৬৬ কেজি চা গড়ে ২৩৬ টাকা ৮৫ পয়সা দরে বিক্রি হয়েছে।
চা বোর্ড-সংশ্লিষ্টদের তথ্য বলছে, ২০২৩-২৪ মৌসুমে দেশে চায়ের গড় মূল্য ছিল প্রতি কেজি ১৭১ টাকা। ২০২৪-২৫ মৌসুমে ফ্লোর প্রাইস চালুর পর তা বেড়ে ২০২ টাকায় পৌঁছালেও উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় তা যথেষ্ট ছিল না। পরে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ফ্লোর প্রাইস পুনর্নির্ধারণ করা হলে গড় মূল্য বেড়ে ২৪৫ টাকায় উঠে আসে। চলতি মৌসুমেও সেই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের সদস্য (অর্থ ও পরিকল্পনা) ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি বলেন, উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে শুধু ফ্লোর প্রাইস নয়, বাগানগুলোর নিজস্ব উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। উৎপাদন ব্যয় সমন্বয় এবং বাজারে ভালো মূল্য পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে উদ্যোক্তারা উন্নতমানের চা উৎপাদনে মনোযোগ দিয়েছেন। চা বোর্ডের তদারকি এবং দেশীয় বাজারে মানসম্মত চায়ের চাহিদা বৃদ্ধিও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, গুণগত মান বজায় রাখতে পারলে দেশের বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের চা আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

