হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের নির্মাণ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছালেও এখনো বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয়নি। ফলে একদিকে প্রকল্পটি চালু না হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে বড় অঙ্কের জাপানি ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ সামনে চলে এসেছে।
চলতি বছরেই বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে দুই কিস্তিতে মোট ২২০০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। এটি সংস্থাটির এক বছরের উদ্বৃত্ত আয়ের প্রায় সমান। প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্প থেকে এখনো কোনো আয় শুরু না হলেও ঋণ শোধের সময় ঘনিয়ে আসায় আর্থিক চাপ বাড়ছে।
প্রকল্পটির জন্য নেওয়া প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকার জাপানি ঋণের প্রথম কিস্তি এ মাসেই ১২০০ কোটি টাকা এবং দ্বিতীয় কিস্তি ডিসেম্বরে ১০০০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। ২০৫৬ সাল পর্যন্ত এই ঋণের কিস্তি চলবে। প্রথম কিস্তি শুরুর সময় দেড় বছর আগেই নির্ধারিত ছিল, তবে টার্মিনাল চালু না হওয়ায় জাপানি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সময় বাড়িয়ে নেওয়া হয়। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন) এস এম লাবলুর রহমান জানান, ঋণের অর্থ প্রথমে অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে, পরে সেখান থেকে জাপানি কর্তৃপক্ষকে পরিশোধ করা হবে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, সময়ক্ষেপণের কারণে প্রকল্পে কয়েক বছরের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। তার মতে, নির্মাণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অপারেটর নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা চুক্তি সম্পন্ন করা উচিত ছিল। তাহলে টার্মিনালের আয় থেকেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ সম্ভব হতো। তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ২০২৭ সালের শেষ বা ২০২৮ সালের আগে পূর্ণ সক্ষমতায় টার্মিনাল চালু করা কঠিন। তার ভাষায়, দ্রুত বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু না হলে এই প্রকল্প দেশের এভিয়েশন খাতের বড় সুযোগ হওয়ার বদলে আর্থিক বোঝায় পরিণত হতে পারে।
সূত্র অনুযায়ী, তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছে ২১ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন ৫ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা এবং বাকি ১৬ হাজার ১৪১ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দিয়েছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা। চুক্তি অনুযায়ী, এই ঋণের প্রথম কিস্তি শুরু হওয়ার কথা ছিল চলতি বছরের জুনে এবং দ্বিতীয় কিস্তি ডিসেম্বর মাসে। ঋণ পরিশোধ ২০৫৬ সাল পর্যন্ত চলবে। প্রকল্পটি শুরুতে দেড় বছর আগেই চালুর কথা থাকলেও বিলম্বের কারণে সেটি হয়নি। ফলে টার্মিনাল চালুর আগেই ঋণ পরিশোধের চাপ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাপানের সঙ্গে পরিচালনা চুক্তি নিয়ে কার্যকর সমঝোতা না হওয়াও বিলম্বের অন্যতম কারণ। পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের সময় বাড়ানোর ক্ষেত্রে শক্ত অবস্থান না নেওয়ার বিষয়টিও দায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মফিদুর রহমান বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্বল নেতৃত্বের কারণে প্রকল্পটি সময়মতো এগোয়নি। তার মতে, এত বড় প্রকল্পে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনার ঘাটতি ছিল। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কার্যকর উদ্যোগের অভাব প্রকল্পকে পিছিয়ে দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিলম্ব যত বাড়বে, আর্থিক ক্ষতি তত বাড়বে এবং সেই চাপ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে। অপারেটরের প্রস্তুতি, জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করতেও দীর্ঘ সময় লাগে, তাই দেরি হলে প্রকল্পের অর্থনৈতিক ঝুঁকি আরও বাড়ে।
সূত্র বলছে, বর্তমানে বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা প্রায় ৮০ লাখ। তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে এটি বেড়ে এক কোটি আশি লাখের বেশি যাত্রীতে পৌঁছাবে। একই সঙ্গে কার্গো ব্যবস্থাপনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সক্ষমতা বাড়লেই রাজস্ব বাড়বে না। নতুন আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন আকর্ষণ, ট্রানজিট যাত্রী বৃদ্ধি, কার্গো ব্যবসার সম্প্রসারণ এবং বাণিজ্যিক স্থাপনার দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
অর্থনীতিবিদ ও অবকাঠামো বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকার এই বিনিয়োগ লাভজনক করতে হলে যাত্রী ও কার্গো উভয় খাতে বড় প্রবৃদ্ধি দরকার। যদিও টার্মিনালের নির্মাণকাজ প্রায় ৯৯ শতাংশ শেষ, তবুও পরিচালনা কাঠামো ও রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তৃতীয় টার্মিনাল চালুর বিষয়ে উদ্যোগ বাড়ানো হয়েছে। জাপানের বিমান পরিবহণ মন্ত্রীর সঙ্গে পাঁচ দফা বৈঠক করেছেন বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম। এ ছাড়া বিষয়টি নিয়ে পাঁচটি বিশেষ সভাও হয়েছে।
দীর্ঘ আলোচনার পর চারটি প্রধান খাত—বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি, লাউঞ্জ, কার্গো হ্যান্ডলিং ও কার পার্কিং থেকে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব জাপানি কনসোর্টিয়ামের হাতে দেওয়ার বিষয়ে কাঠামো চূড়ান্ত হয়। এসব খাত থেকে আয়ের ৭৩ শতাংশ পাবে জাপানি পক্ষ এবং ২৭ শতাংশ পাবে বাংলাদেশ। ওভার ফ্লাইং চার্জ এবং বিমান অবতরণ ফি থাকবে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের হাতে। কাস্টমস, নিরাপত্তা ও ইমিগ্রেশন কার্যক্রম পরিচালিত হবে বাংলাদেশের তত্ত্বাবধানে।
এ লক্ষ্যে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে প্রস্তাব আহ্বান নথি জারি করেছে। ১৭ মে জাপানি প্রতিষ্ঠানের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়। এতে জুলাই মাসের শেষ দিকে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে প্রাথমিক ঐকমত্য হয়েছিল। তবে শেষ মুহূর্তে জাপানি পক্ষ জানায়, চুক্তির জন্য আরও দুই মাস সময় প্রয়োজন। পাশাপাশি তারা নতুন কিছু শর্তও উত্থাপন করেছে। এতে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে চলতি বছরের মধ্যে টার্মিনাল চালু করা সম্ভব নাও হতে পারে। কারণ চুক্তির পর প্রস্তুতি ও বাস্তবায়নে আরও ছয় মাস সময় লাগবে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিকী বলেন, আলোচনা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে জাপানি পক্ষ অতিরিক্ত সময় চাওয়ায় বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, “দুই বছর ধরে আলোচনা চললেও শেষ মুহূর্তে তাদের অবস্থান পরিবর্তনে আমরা বিস্মিত। তবে আমরা এখনো আশাবাদী। সরকারের উচ্চপর্যায়ের উদ্যোগ থাকলে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যেই তৃতীয় টার্মিনাল চালু করা সম্ভব।”
অন্যদিকে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছেন, ১৬ ডিসেম্বর তৃতীয় টার্মিনাল উদ্বোধনের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং সেই লক্ষ্যেই কাজ চলছে।

