২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে কাস্টমস বন্ড ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে সরকার। এই উদ্যোগে রপ্তানিমুখী নতুন খাতগুলোকেও শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধার আওতায় আনা হচ্ছে। পাশাপাশি তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পে নিয়মকানুন সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। রপ্তানিকারকেরা মনে করছেন, এতে দেশের বাণিজ্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত নজরদারি ও কঠোর বাস্তবায়ন ছাড়া এসব সংস্কার অপব্যবহারের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। প্রস্তাবিত পরিবর্তনের আওতায় ২০২৪ সালের বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্সিং বিধিমালা, রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, সাধারণ বন্ড বিধিমালা এবং বার্ষিক আমদানি সুবিধা ও গুদাম ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নিয়মে সংশোধন আনা হবে।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, পুরোপুরি নিয়ম মেনে চলা তৈরি পোশাক কারখানার ক্ষেত্রে বার্ষিক বন্ড অডিট বাতিল করা হবে। বন্ড লাইসেন্সের মেয়াদ এক বছর থেকে বাড়িয়ে তিন বছর করা হবে। বন্ডেড গুদামে মজুদের সীমা তুলে দেওয়া এবং ব্যবহারের অনুমোদন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। এছাড়া বন্ডেড কাঁচামাল লাইসেন্সধারী গুদাম ও রপ্তানিমুখী শিল্পের মধ্যে স্থানান্তরের সুযোগ তৈরির কথাও বলা হয়েছে।
শুধু তৈরি পোশাক নয়, চামড়া, জুতা, টেরি তোয়ালে, ওষুধ ও গয়না খাতও এই সুবিধার আওতায় আসবে। গয়না রপ্তানি বাড়াতে স্বর্ণবার ও স্বর্ণের স্ক্র্যাপ আমদানির জন্য আলাদা বন্ডেড সুবিধার কাঠামো তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এসব পদক্ষেপ উৎপাদনের সময় কমাবে এবং খরচও হ্রাস করবে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক ও রপ্তানিমুখী একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, বন্ড অডিট বাতিল ও মজুদের সীমা তুলে দেওয়া রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াবে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে মূলধনের চাপ কমলে বিনিয়োগ বাড়বে এবং নতুন খাতগুলো রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে পারবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বেশিরভাগ উদ্যোক্তার শুরুতেই পর্যাপ্ত মূলধন থাকে না। তাই বড় বিনিয়োগের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই তা করতে পারেন না। ওষুধ, চামড়া ও জুতা খাতের উদ্যোক্তারাও বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা সম্প্রসারণকে স্বাগত জানিয়েছেন।
এই খাতগুলো সাধারণত একই কাঁচামাল দিয়ে দেশীয় ও রপ্তানি উভয় বাজারের জন্য পণ্য তৈরি করে। আগে তারা রপ্তানির পর শুল্ক ফেরত সুবিধা পেলেও এখন শুরু থেকেই শুল্কমুক্ত আমদানির সুযোগ পাবে, যা নগদ অর্থের চাপ কমাবে। তবে কিছু শিল্পপ্রতিনিধি সতর্ক করেছেন, সব খাতে একই নীতি প্রয়োগ সবসময় কার্যকর নাও হতে পারে।
একজন শিল্প নেতা বলেন, প্রতিটি খাতের উৎপাদন প্রক্রিয়া ও বাজার ভিন্ন। তাই একই ধরনের নীতি সবার জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে। ডেলটা ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, ওষুধ খাতে এই সুবিধার তাৎক্ষণিক প্রভাব সীমিত হতে পারে।
তিনি বলেন, পুরো সুবিধা পেতে আলাদা বন্ডেড ব্যবস্থা ও নির্দিষ্ট রপ্তানি বাজার প্রয়োজন, যা সময়সাপেক্ষ। অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদন পেতে তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত লাগে। তিনি আরও বলেন, একই কাঁচামাল দিয়ে দেশীয় ও রপ্তানি বাজারে ওষুধ তৈরি হয়। রপ্তানির পর শুল্ক ফেরত সুবিধা পাওয়া গেলেও শুরুতেই সুবিধা পাওয়া যায় না। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাড়াতে শুল্কমুক্ত সুবিধা একটি স্বাভাবিক নীতিগত উপায়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বছরে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার বন্ড সুবিধা দেয় রপ্তানিমুখী খাতগুলোকে। তবে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের ধারণা, অনিয়ম, মিথ্যা ঘোষণা ও দেশীয় বাজারে পণ্য সরানোর কারণে প্রতি বছর ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হতে পারে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ডিজিটাল নজরদারি না বাড়ালে এসব সুবিধার অপব্যবহার হতে পারে। তিনি বলেন, কার্যকর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা থাকলে রপ্তানি আয়, পণ্যের বৈচিত্র্য, কর্মসংস্থান ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে।
বিশেষজ্ঞ জাহিদ হোসেনও একই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ না করলে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা পুরো সুবিধা পাবেন না। তাই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা ছাড়া বিকল্প নেই। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্য কাজী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অবিলম্বে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন প্রয়োজন।
তিনি পরামর্শ দেন, বন্দরের পণ্য থেকে কারখানা পর্যন্ত রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অনুমোদন ও ঘোষণা একীভূত করা এবং ঝুঁকিভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় নিরীক্ষা ব্যবস্থা চালু করা উচিত। তিনি আরও বলেন, অনিয়মে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংস্কারের সফলতা নির্ভর করবে রাজস্ব বোর্ডের সক্ষমতার ওপর, যেখানে বাণিজ্য সহজীকরণ ও কঠোর নজরদারির মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা বাংলাদেশে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর বন্ড ব্যবস্থাপনা রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

