প্রস্তাবিত বাজেটে আবাসন খাতে নতুন কর আরোপকে “আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)-এর সভাপতি ড. মো. আলী আফজাল রিহ্যাব। তিনি বলেছেন, ৫ কাঠা জমিতে ভবন নির্মাণে অতিরিক্ত প্রায় দেড় কোটি টাকা কর এবং ডেভেলপারদের নির্মিত ফ্ল্যাটের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপ হলে আবাসন খাত বড় ধরনের সংকটে পড়বে।
গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ প্রতিদিনের বিজনেস টকশোতে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন তনিমা রহমান। ড. আলী আফজাল বলেন, একজন মানুষ জীবনের সঞ্চয় দিয়ে ৫ কাঠা জমি কিনে ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করলে অতিরিক্ত দেড় কোটি টাকার করের বোঝা তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে দিতে পারে। এতে অনেকেই ভবন নির্মাণ থেকে সরে দাঁড়াবেন এবং জমি অব্যবহৃত পড়ে থাকবে। এর ফলে নতুন বিনিয়োগ কমবে এবং উন্নয়ন কার্যক্রমও ধীর হয়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, এই করের চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ ক্রেতাদের ওপরই পড়বে। কারণ কোনো ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান লোকসান দিয়ে ব্যবসা চালাতে পারবে না। একই সঙ্গে জমির মালিকরাও করের বোঝা ডেভেলপারদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করবেন। ফলে প্রকল্প ব্যয় বাড়বে এবং ফ্ল্যাটের দামও বেড়ে যাবে।
রিহ্যাব সভাপতি সতর্ক করে বলেন, নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং কাঁচামালের উচ্চমূল্যের মধ্যে নতুন কর যুক্ত হলে আবাসন প্রকল্পের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। এতে বর্তমানে যে ফ্ল্যাট নির্দিষ্ট দামে বিক্রি করা সম্ভব, সেটি আরও বেশি দামে বিক্রি করতে হবে। এর চূড়ান্ত চাপ বহন করতে হবে সাধারণ ক্রেতাদের।
তিনি বলেন, আবাসন খাতকে দীর্ঘদিন ধরে ভুলভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। অনেকের ধারণা, এটি উচ্চ আয়ের খাত এবং এখান থেকে সহজে রাজস্ব আদায় করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে এমন ধারণা ভুল। অতিরিক্ত কর আরোপ করলে বিনিয়োগ কমবে, নির্মাণ ব্যয় বাড়বে এবং রাজস্ব আহরণও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ড. আলী আফজাল আরও জানান, বাংলাদেশে ফ্ল্যাট ক্রেতাদের বড় অংশ ধনী নন। মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং বিভিন্ন পেশাজীবী, বিশেষ করে সরকারি চাকরিজীবীরাই এই খাতের প্রধান ক্রেতা। অতিরিক্ত করের কারণে ফ্ল্যাটের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তারাই।
তিনি বলেন, আবাসন মানুষের মৌলিক চাহিদার একটি অংশ। তাই অনেক দেশে প্রথমবার বাড়ি নির্মাণ বা কেনার ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়তা দেওয়া হয়। কোথাও অনুদান, কোথাও আবার স্বল্প সুদে ঋণের সুবিধা রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি অস্ট্রেলিয়ার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে প্রথম বাড়ি কেনায় সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়।
ড. আলী আফজাল আরও বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আবাসন খাতকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে দেখে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে আবাসন খাত চাঙা করতে বিশেষ নীতি গ্রহণের উদাহরণ রয়েছে, যা অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে সহায়তা করেছে। তিনি বলেন, ইউরোপ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও আবাসন খাতকে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন ত্বরান্বিত করছে। কিন্তু বাংলাদেশে এই খাত দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত।
বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১৩ থেকে ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির কারণে নির্মাণ ব্যয় ইতোমধ্যে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এর ওপর নতুন কর চাপ যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়বে। সব মিলিয়ে ড. মো. আলী আফজাল মনে করেন, প্রস্তাবিত করনীতি বাস্তবায়িত হলে আবাসন খাতের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

