বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেটে সবচেয়ে বড় চাপ হিসেবে সামনে এসেছে রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা। বিশ্লেষকদের মধ্যে এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, হিসাবের অঙ্ক সহজভাবে মিলছে না। তবে নতুন সরকারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনগণের কাছে তাদের লক্ষ্য ও দিকনির্দেশনা স্পষ্ট করা। সেই বিচারে বাজেটকে পুরোপুরি অস্থির বা বেপরোয়া বলা যাচ্ছে না।
একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়তে হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্বে যোগ্যতা, জ্ঞান এবং সুনামের ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। এই দিক থেকে সরকারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রশ্ন উঠলেও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর মাধ্যমে একটি স্পষ্ট অগ্রাধিকার দেখা যাচ্ছে। একইভাবে স্বাস্থ্য খাতেও বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিশেষজ্ঞদের মতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
রাজস্ব ঘাটতির চিত্রকে একেবারে সংকটজনক বলা কঠিন কারণ ২০২৭ অর্থবছরে মোট বাজেট ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এটি মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৪ শতাংশ। অন্যদিকে চলমান ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশের কাছাকাছি।
এর আগের ২০২৪–২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আয় ছিল মোট ব্যয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশ। সে সময় বিনিয়োগে ধীরগতি, জনজীবনের অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক মনোযোগের বিভাজনের প্রভাব পড়েছিল বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। তবে ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বাজেটকে তারা আগের ধারার বাইরে সম্পূর্ণ নতুনও মনে করছেন না। বরং এটিকে আগের কাঠামোর ওপর কিছু নতুন সংযোজন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি বড় ঝুঁকি সামনে ছিল। প্রথম ঝুঁকি ছিল বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা পুনরায় চালুর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন। এ পরিস্থিতির দায় রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেও সরকারের ওপরই বর্তায় বলে আলোচনা আছে। পরে কৌশলগতভাবে এর কিছু চাপ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দিকে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
দ্বিতীয় বড় চাপ আসে বেতন কাঠামো বা পে স্কেল নিয়ে তৈরি হওয়া অকাল উত্তাপ থেকে। এটি অন্তর্বর্তী সরকারের মূল কর্মপরিকল্পনায় না থাকলেও পরিস্থিতি এমনভাবে তৈরি হয় যে বেতন বৃদ্ধির দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। তবে যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে ধাপে ধাপে নেওয়াই বেশি বাস্তবসম্মত, কারণ এতে রাজস্ব ব্যবস্থার ভারসাম্য জড়িত থাকে।
তৃতীয় চাপ ছিল অনাদায়ী রাজস্বের বড় অঙ্ক, যা প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে প্রশাসনিক ব্যয় কমানোর দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকায় বাজেট ব্যবস্থাপনায় চাপ আরও বাড়ে। এই পরিস্থিতি সামাল দিয়ে বাজেট কাঠামোকে স্থিতিশীল অবস্থায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে বাজেট বক্তৃতার প্রথম দিকেই অতীত সরকারের ব্যর্থতা ও অর্থনৈতিক ধ্বংসের চিত্র তুলে ধরা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, এমন বয়ান আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ পরিবেশে নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির তুলনামূলক চিত্র টেনে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত দেড় দশকে বৈশ্বিক গড় প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় তিন শতাংশ। একই সময়ে চীনের প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় পৌনে সাত শতাংশ, বাংলাদেশ ও ভারতের প্রায় ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ, ভিয়েতনামের ৬ দশমিক ১২ শতাংশ, মালয়েশিয়ার ৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং সিঙ্গাপুরের ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে মিয়ানমার, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার প্রবৃদ্ধি ছিল তুলনামূলকভাবে কম।
এই পরিসংখ্যানের আলোকে সমালোচকদের প্রশ্ন, যদি বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে ছয় শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে থাকে, তবে দেশকে ‘ধ্বংসস্তূপ’ হিসেবে উপস্থাপন করা কতটা যুক্তিযুক্ত। তাদের মতে, ভাষার নির্বাচনে বাস্তব অর্থনীতির অর্জনকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিকে বাজেটের একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। শিক্ষা খাতে আধুনিকায়ন, প্রযুক্তিনির্ভরতা, বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বহির্বিশ্বে কর্মসংস্থানযোগ্য জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
তবে শিক্ষা খাতের কিছু সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে সংগীত শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের মতে, বৈশ্বিক শ্রমবাজারে সৃজনশীল ও সাংস্কৃতিক দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে, তাই এ ধরনের উদ্যোগকে সংকীর্ণভাবে দেখার সুযোগ নেই।
আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক সংগীত শিল্পের বাজার এক দশকের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশ এই খাতে দক্ষ জনবল তৈরি ও নিয়োগ দিচ্ছে। ফলে শিক্ষাব্যবস্থায় এই দিকটিকে অন্তর্ভুক্ত করার যুক্তি রয়েছে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
অন্যদিকে, শিক্ষানীতির দিকনির্দেশনা নিয়ে কিছু প্রশ্নও উঠেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মডেল বা দেশের উদাহরণ টানার ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিশ্লেষণ জরুরি বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
বাজেটের অন্যতম বড় লক্ষ্য হলো ২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। বর্তমান অর্থনীতির আকার ও প্রবৃদ্ধির প্রয়োজনীয় হার বিবেচনায় এটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যদি ধারাবাহিকভাবে প্রায় ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়, তবে নির্ধারিত সময়েই লক্ষ্য পূরণ করা যেতে পারে। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে তুলনামূলকভাবে কম প্রবৃদ্ধি ধরা হলে লক্ষ্য অর্জনে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। সব মিলিয়ে বাজেটকে একদিকে যেমন উন্নয়ন ও সংস্কারের দিকনির্দেশনা হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি রাজস্ব সক্ষমতা ও বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
- ড. বিরূপাক্ষ পাল: যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক অ্যাট কোর্টল্যান্ডে অর্থনীতির অধ্যাপক।

