দেশের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠী আব্দুল মোনেম সুগার রিফাইনারি লিমিটেডকে ১০০ শতাংশ মার্জিনে ঋণপত্র খোলার বিশেষ সুযোগ দিতে সরকারের অনুমোদন চেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রায় ৪৫৫ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের জামিনদার এই প্রতিষ্ঠানকে আগামী ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত এই সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। মূল উদ্দেশ্য শোধনাগার সচল রাখা এবং কাঁচামাল আমদানি অব্যাহত রাখা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে এবং বাজারে চিনির সরবরাহ নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকে আব্দুল মোনেম লিমিটেডের খেলাপি ঋণের করপোরেট জামিনদার হিসেবে রয়েছে আব্দুল মোনেম সুগার রিফাইনারি লিমিটেড। মূল কোম্পানি হিসেবে কাজ করছে আব্দুল মোনেম গ্রুপ। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী খেলাপি ঋণের জামিনদার প্রতিষ্ঠানও খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে তারা নতুন ঋণ সুবিধা বা ঋণপত্র খোলার সুযোগ পান না।
তবে একই আইনের বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এই নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি দিতে পারে। এই ক্ষমতা ব্যবহার করেই গত ১৬ জুন কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে বিশেষ অনুমোদনের জন্য চিঠি পাঠায়। এরপর বিষয়টি ৭ জুন গভর্নরের কাছে উপস্থাপন করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, আইন অনুযায়ী বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামতের ওপর নির্ভরশীল। মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিলে তবেই এই সুবিধা কার্যকর হবে। অনুমোদন না পেলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের মার্চের তথ্য অনুযায়ী, অগ্রণী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক এবং ডাচ-বাংলা ব্যাংকসহ ২৪টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আব্দুল মোনেম লিমিটেডের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬৯৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু অগ্রণী ব্যাংকের পাওনা প্রায় ৪৫৫ কোটি টাকা। গত বছরের আগস্টে প্রতিষ্ঠানটি এসব ঋণ বিশেষ শর্তে পুনর্গঠনের আবেদন করে।
শোধনাগার কর্তৃপক্ষের দাবি, অপরিশোধিত চিনি আমদানির জন্য আন্তর্জাতিক কয়েকটি চুক্তি এখনো চালু আছে। ঋণপত্র খোলা সম্ভব না হলে প্রতিদিন প্রায় ২৩ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে। একই সঙ্গে দেশের সীমিত সংখ্যক চিনি শোধনাগার পূর্ণ সক্ষমতায় চলায় আমদানি ব্যাহত হলে বাজারে সরবরাহ সংকট দেখা দিতে পারে। বর্তমানে শোধনাগারটি ক্রয়চুক্তির ভিত্তিতে আবুল খায়ের লিমিটেড পরিচালনা করছে। উৎপাদিত চিনি ‘স্টারশিপ সুগার’ নামে বাজারজাত হচ্ছে। তবে মালিকানা হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি।
আব্দুল মোনেম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এস এম মঈনউদ্দিন মোনেম বলেন, ক্রেতা প্রতিষ্ঠান আবুল খায়ের গ্রুপ ব্যাংক ও বন্ডের সব দায় পরিশোধ করবে বলে জানানো হয়েছে। তার ভাষায়, অগ্রণী ব্যাংকের সহযোগিতা না পাওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। তিনি আরও বলেন, শোধনাগার বিক্রির বিষয়টি আগে জানানো না হওয়ায় ব্যাংকের আস্থা সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে তারা সহযোগিতা করছে না।
ব্যবসার সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকগুলো নতুন অর্থায়ন বন্ধ রেখেছে। গত ১৮ মাসে কোনো ব্যাংক ঋণ দেয়নি। এতে নির্মাণ কার্যক্রমও কমে গেছে এবং ব্যবসা চাপে রয়েছে।
১৯৫৬ সালে প্রয়াত শিল্পপতি আব্দুল মোনেম এই শিল্পগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নির্মাণ, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, কোমল পানীয়, ওষুধ ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে বিস্তার ঘটে। ২০০৭ সালে সুগার রিফাইনারিটি চালু হয়। ২০২০ সালে তার মৃত্যুর পর অতিরিক্ত ঋণ, টাকার অবমূল্যায়ন এবং সরকারি বড় প্রকল্পের গতি ধীর হয়ে যাওয়ার প্রভাবে গ্রুপটির একাধিক প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়ে।

