বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত এখন এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। বিশ্ববাজারে দিন দিন বাড়ছে কৃত্রিম তন্তু বা ম্যান মেইড ফাইবারভিত্তিক পোশাকের চাহিদা। তুলাভিত্তিক পোশাকের তুলনায় এসব পণ্যের মূল্যও বেশি। তবে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ শুল্কের কারণে এই খাতে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সম্ভব হয়নি। উদ্যোক্তাদের বহুদিনের দাবির পর আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যা খাতটির জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রস্তাবিত বাজেটে কৃত্রিম তন্তুর পোশাক উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল সিন্থেটিক ফেব্রিক্সের ওপর আরোপিত ১০ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি আরও কয়েকটি কাঁচামালের ক্ষেত্রেও শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। উদ্যোক্তাদের মতে, এর ফলে উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদন সহজ হবে এবং রপ্তানি সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে।
বিশ্বের তৈরি পোশাক বাজারে বর্তমানে ম্যান মেইড ফাইবারভিত্তিক পোশাকের অংশ প্রায় ৭০ শতাংশ। বিপরীতে প্রাকৃতিক তন্তু থেকে তৈরি পোশাকের অংশ প্রায় ৩০ শতাংশ। বৈশ্বিক বাজারে কৃত্রিম তন্তুর ব্যবহার ক্রমাগত বাড়লেও বাংলাদেশের চিত্র এখনও ভিন্ন। দেশের মোট রপ্তানিমুখী পোশাকের মাত্র ২৯ শতাংশ কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক, আর বাকি ৭১ শতাংশ তুলাভিত্তিক। অন্যদিকে প্রধান প্রতিযোগী চীনের মোট পোশাক রপ্তানির ৫২ শতাংশই কৃত্রিম তন্তুর পণ্য। বাজেটে ঘোষিত সুবিধাগুলোকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, অতীতে কোনো বাজেটে এই খাত এত বিস্তৃত সুবিধা পায়নি।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, কৃত্রিম তন্তুর কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের ওপর শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে, যা এ ধরনের পোশাকের রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। তবে পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবারের ওপর ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক এবং পিভিসি রেজিন ও পিইটি রেজিনের ওপর অতিরিক্ত ৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করা হলে শিল্প আরও বেশি উপকৃত হতো।
একই ধরনের মত দিয়েছেন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তার ভাষ্য, রপ্তানি খাতের জন্য এটি সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম সহায়ক বাজেট। কৃত্রিম তন্তুর পোশাকের কাঁচামালে শুল্ক ছাড় রপ্তানি আয় বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কারণ এ ধরনের পোশাকের মূল্য বেশি এবং বিশ্ববাজারে এর চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। তবে পিএসএফ, পিভিসি রেজিন ও পিইটি রেজিনের ওপর অতিরিক্ত ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তকে তিনি বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেন। তার মতে, দেশে একটি মাত্র প্রতিষ্ঠান এ ধরনের কাঁচামাল উৎপাদন করে, যা মোট চাহিদার ১০ শতাংশেরও কম।
শুধু কাঁচামাল নয়, রপ্তানি খাতের জন্য আরও কয়েকটি কর-সুবিধাও রাখা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। রপ্তানির নগদ সহায়তার ওপর আয়কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে কেনা বিদ্যুতের ওপর উৎস কর ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করা হচ্ছে। পুনর্ব্যবহৃত ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাঁচামালের ওপর করহারও ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
উদ্যোক্তাদের জন্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো উৎসে কর্তিত করকে ‘অগ্রিম কর’ হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব। এতদিন অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত করযোগ্য আয় কম হলেও উৎসে কর্তিত করকে চূড়ান্ত বা ন্যূনতম কর হিসেবে ধরা হতো, যা ব্যবসার মূলধনের ওপর চাপ সৃষ্টি করত। নতুন ব্যবস্থায় অর্থবছর শেষে সমন্বয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত পরিশোধিত অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এতে রপ্তানি খাতে তারল্য সংকট কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মাহমুদ হাসান খান মনে করেন, সার্বিকভাবে প্রস্তাবিত বাজেট ব্যবসাবান্ধব। তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরের জন্য করকাঠামোর একটি স্পষ্ট পথনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা আগে থেকেই করব্যয়ের বিষয়ে ধারণা পাবেন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা গ্রহণ সহজ হবে। একই সঙ্গে করপোরেট কর অপরিবর্তিত রাখা এবং উৎসে কর সমন্বয়ের সুযোগও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে পোশাক রপ্তানি ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্য অর্জনে কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাকের অংশ ৪০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে উদ্যোক্তাদের মতে, কাঁচামালের সীমিত প্রাপ্যতাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে এই খাতের প্রায় ৮০ শতাংশ কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এর বড় অংশ আসে চীন থেকে। স্থানীয়ভাবে মাত্র ২০ শতাংশ কাঁচামালের জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে।
বিশ্ববাজারে মোট পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় হলেও কৃত্রিম তন্তুর পোশাক রপ্তানিতে দেশটির অবস্থান চতুর্থ। এই বাজারের ৩৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে চীন। নিজস্ব কাঁচামাল ও উন্নত প্রযুক্তির কারণে দেশটি কম খরচে দ্রুত উৎপাদন ও সরবরাহ করতে সক্ষম। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ভিয়েতনামের বাজার অংশীদারিত্ব ১২ শতাংশ। চীনের নিকটবর্তী হওয়ায় দেশটি দ্রুত কাঁচামাল সংগ্রহের সুবিধা পায়। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন রপ্তানিকারক দেশ, যাদের সম্মিলিত অংশ ১০ শতাংশ। বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব বর্তমানে ৫ শতাংশ। অবশিষ্ট ৪০ শতাংশ বাজার ভারত, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ ভাগাভাগি করে নিচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে পরিবেশ সচেতনতা বাড়ার সঙ্গেও কৃত্রিম তন্তুর পোশাকের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তুলা উৎপাদন থেকে শুরু করে সুতা তৈরি, রং করা ও অন্যান্য প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ পানি প্রয়োজন হয়। ফলে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা। কৃত্রিম তন্তুর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কাঁচামাল পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব হওয়ায় এটি সার্কুলার অর্থনীতির অংশ হিসেবে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। পাশাপাশি দ্রুত পরিবর্তনশীল ফ্যাশন, টেকসই ব্যবহার এবং আরামদায়ক বৈশিষ্ট্যের কারণেও এ ধরনের পোশাকের চাহিদা বাড়ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ প্রায় ৩০ ধরনের কৃত্রিম তন্তুর পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানি করছে। এর মধ্যে রয়েছে গাউন, ওভারকোট, টাই, স্যুট-কোট, জার্সি, ট্রাউজার, পুলওভার ও শার্ট। সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয় জার্সি ও পুলওভার।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে তুলাভিত্তিক পোশাক রপ্তানি কিছুটা কমলেও কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাকের রপ্তানি ১৪ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে সুতা ও কাপড় উৎপাদনেও বিনিয়োগ বাড়ছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনটির ৪০টি সদস্য কারখানা কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে সুতা ও কাপড় উৎপাদনে বিনিয়োগ করেছে। বিশেষ করে পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার ও ভিসকস স্ট্যাপল ফাইবারের চাহিদা বেশি হওয়ায় এ খাতে বিনিয়োগও বাড়ছে।
বিশ্ববাজারের পরিবর্তিত চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাক শিল্পে গুরুত্ব বাড়াচ্ছে। এর ফলে প্রচলিত তুলা, পাট ও অন্যান্য প্রাকৃতিক আঁশের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিতে দেশ আরও শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

