রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতে উৎসে করের হার ও এর বাস্তব প্রয়োগ ঘিরে আবারও তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বাজেট এলেই এই ইস্যু ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হলেও বছরের পর বছর ধরে সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে উদ্যোক্তাদের মধ্যে। বর্তমানে রপ্তানি আয়ের ওপর মোট দামের এক শতাংশ হারে উৎসে কর কেটে রাখা হচ্ছে, যা উদ্যোক্তারা বেশি বলে মনে করছেন।
নিয়ম অনুযায়ী, রপ্তানি আয়ের বিপরীতে এই কর অগ্রিম হিসেবে কাটা হয় এবং বছরের শেষে অন্যান্য করের সঙ্গে সমন্বয় করার কথা। কিন্তু উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, বাস্তবে এই সমন্বয়ের কোনো কার্যকর উদাহরণ নেই। বরং দীর্ঘদিন ধরে এ প্রক্রিয়া জটিলতা ও হয়রানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এবারের বাজেটকে কেন্দ্র করে তৈরি পোশাক শিল্পের দুই প্রধান সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে উৎসে কর কমানোর দাবি জানিয়েছে। তারা বর্তমান এক শতাংশ হার কমিয়ে শূন্য দশমিক শূন্য ছয় পাঁচ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে এই হারকে চূড়ান্ত কর দায় হিসেবে নির্ধারণ এবং অন্তত পাঁচ বছর তা অপরিবর্তিত রাখার দাবি জানানো হয়েছে।
২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে এই হার শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে এক শতাংশ করা হয়। উদ্যোক্তাদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই হার অত্যন্ত চাপ তৈরি করছে। এর আগে বিভিন্ন সময় বৈরী পরিস্থিতি বিবেচনায় এক বছরের জন্য শূন্য দশমিক দুই পাঁচ ও শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ হারে উৎসে কর নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে প্রজ্ঞাপন দিয়ে তা কার্যকর করা হয়।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম অভিযোগ করে বলেছেন, নিয়ম থাকলেও উৎসে কর কখনোই অন্যান্য করের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়নি। তার মতে, বাস্তবে এই কর ফেরত বা সমন্বয়ের কোনো নজির নেই। তিনি আরও বলেন, তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠানেও কর সমন্বয়ের বদলে নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা ও হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছে। দীর্ঘ আলোচনার পরও এ সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি।
বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান মনে করেন, উৎসে কর কমানো না হলে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। এতে কর্মসংস্থান কমার পাশাপাশি শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, রপ্তানি আদেশ কমে গেলে শ্রমিকদের বেতন দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়বে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা চাপে পোশাক শিল্প এখন কঠিন সময় পার করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমার পাশাপাশি প্রতিযোগিতা বেড়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে আগের বছরের তুলনায় পোশাক রপ্তানি কমেছে শূন্য দশমিক তিন চার এক শতাংশ। শুধু মে মাসেই কমেছে শূন্য দশমিক দুই নয় শতাংশের বেশি।
কারখানাগুলো পুরো সক্ষমতায় চলতে না পারায় উৎপাদন কমলেও স্থায়ী খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এতে মোট উৎপাদন ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলার পরিমাণও কমেছে প্রায় শূন্য দশমিক ছয় সাত নয় শতাংশ।
উদ্যোক্তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি এবং ইউরোপে চীনা পণ্যের মূল্য হ্রাস বাংলাদেশের রপ্তানি মূল্যে চাপ তৈরি করেছে। এর ফলে পোশাকের গড় একক মূল্যও কমেছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা কাঁচামালের দাম বাড়িয়েছে। কিন্তু ক্রেতারা সেই অনুপাতে পণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন না।
ব্যাংক ঋণের সুদের হার এখন ১২ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি গত কয়েক বছরে জ্বালানি খরচও ব্যাপক বেড়েছে। গ্যাসের দাম কয়েক বছরে প্রায় ২৮৬ শতাংশ এবং বিদ্যুতের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের ট্যারিফও এক লাফে ৪১ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। একই সময়ে রপ্তানি প্রণোদনাও প্রায় ৬০ শতাংশ কমে গেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পরামর্শক কমিটির বৈঠকে ব্যবসায়ীদের সংগঠন এফবিসিসিআইও উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তারা এক শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ করার সুপারিশ করেছে। সংগঠনটির মতে, বিভিন্ন যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি এবং প্রণোদনা কমে যাওয়ায় রপ্তানিমুখী শিল্পে মুনাফা কমেছে। তাই কর হ্রাস জরুরি।
উদ্যোক্তারা কৃত্রিম তন্তু বা মানবসৃষ্ট ফাইবারের ওপর ভ্যাট অব্যাহতি বজায় রাখার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি পুনর্ব্যবহৃত ফাইবার উৎপাদনে আরোপিত কর প্রত্যাহারেরও আহ্বান জানানো হয়েছে। তাদের মতে, বিশ্ববাজারের বড় অংশ এখন কৃত্রিম তন্তুর ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো মূলত তুলাভিত্তিক হওয়ায় সম্ভাব্য বড় বাজার ধরা সম্ভব হচ্ছে না।
রিসাইক্লিং শিল্প নিয়েও জটিলতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। ঝুট সংগ্রহ থেকে শুরু করে উৎপাদন ও বিক্রির বিভিন্ন ধাপে মূল্য সংযোজন করের চাপ রয়েছে বলে উদ্যোক্তাদের অভিযোগ। এছাড়া সাব-কন্ট্রাক্ট কার্যক্রমে কর হার কমিয়ে এক শতাংশ করারও দাবি জানিয়েছে বিজিএমইএ।
উৎসে কর, জ্বালানি ব্যয়, বৈশ্বিক চাপ ও নীতিগত জটিলতা মিলিয়ে তৈরি পোশাক খাত এখন বহুমুখী সংকটে রয়েছে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, দ্রুত নীতি সমন্বয় না হলে এই খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও কমে যেতে পারে।

