আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এটি ১৮ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মতে, নতুন এই লক্ষ্য অর্জন একেবারে অসম্ভব নয়। তবে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং সাম্প্রতিক রাজস্ব আহরণের ধারা বিবেচনায় এটি অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও ব্যবসায়ী নেতাদের বড় একটি অংশ। তাদের আশঙ্কা, লক্ষ্য পূরণের বাড়তি চাপ শেষ পর্যন্ত নিয়মিত করদাতা এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপরই বেশি পড়তে পারে। রাজস্বে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ও তা অর্জনযোগ্য কি না—এ নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের সঙ্গে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য দেখা গেছে।
নতুন অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে নয় লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য বাদ দিলে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে সরকার দেশীয় ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। তবে রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হলে ঋণের ওপর নির্ভরতা আরও বেড়ে যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে বাড়ছে সংশয়:
সরকারের নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছে তিন লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। বছর শেষে এই অঙ্ক সর্বোচ্চ সাড়ে চার লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
এই হিসাব অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে রাজস্ব আদায়ে ৫০ শতাংশেরও বেশি প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে এমন প্রবৃদ্ধি অর্জন অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্স অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড)। সংস্থাটির চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাকের মতে, নতুন অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রায় অন্তত এক লাখ কোটি টাকার ঘাটতি থাকতে পারে।
এ বিষয়ে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, সরকার একদিকে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করছে, অন্যদিকে বিভিন্ন খাতে করছাড় ও প্রণোদনার মেয়াদও বাড়ানো হচ্ছে। ফলে রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
তিনি আরও বলেন, দেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো ৭ শতাংশের নিচে, যা তুলনামূলকভাবে অনেক দেশের চেয়ে কম। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষায় টেকসই বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হলে করভিত্তি সম্প্রসারণ এবং কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, বাজেটে করব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও এর বাস্তবায়নই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি রিজওয়ান-উর-রহমান বলেন, অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার চাপ বাড়লে কর প্রশাসন অনেক সময় বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। এতে ব্যবসা পরিচালনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এনবিআরের আশাবাদ:
সরকার নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে আশাবাদ প্রকাশ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেছেন, ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর ব্যবস্থাকে সারাদেশে অটোমেশনের আওতায় আনা হবে এবং পুরো ভ্যাট প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা হবে।
তিনি জানান, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে করজাল আরও বিস্তৃত হবে এবং বিপুলসংখ্যক নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় আসবে। তাঁর মতে, শুধু ভ্যাট খাত থেকেই অতিরিক্ত প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
এনবিআর চেয়ারম্যান আরও বলেন, সিগারেট খাতে রাজস্ব ফাঁকি রোধে কিউআর কোড ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ব্যবস্থা কার্যকর করা গেলে এই খাত থেকেই অতিরিক্ত সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়া যেতে পারে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রযুক্তি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, কর ফাঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হলে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব হবে না।
আবদুর রহমান খান আরও জানান, এবারের বাজেটে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা কমাতে বিভিন্ন সুবিধা রাখা হয়েছে। এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে, ব্যবসার পরিধি সম্প্রসারিত হবে এবং স্বাভাবিকভাবেই কর আদায়ও বৃদ্ধি পাবে।
বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপের শঙ্কা:
সরকারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে ভিন্নমত ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তারা মনে করছেন, উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জনের পথে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান জানান, চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬৫ শতাংশ রাজস্ব আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। তাঁর মতে, বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া আগামী অর্থবছরের উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্য অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন হবে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চাপ মাঠপর্যায়ে করদাতাদের হয়রানির ঘটনা বাড়িয়ে দিতে পারে।
একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি রিজওয়ান-উর-রহমান। তিনি বলেন, বাজেটে ব্যবসাবান্ধব কিছু উদ্যোগ থাকলেও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য বাস্তবসম্মত নয়। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, লক্ষ্যমাত্রার চাপ বাড়লে কর প্রশাসন অনেক সময় বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করে, যা ব্যবসা পরিচালনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, করজাল সম্প্রসারণের উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও কেবল বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব অর্জন সম্ভব নয়। তাদের দাবি, কর প্রশাসনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
রাজস্ব বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের আহ্বান:
প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে একাধিক কাঠামোগত সংস্কারের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে করনীতি ও কর প্রশাসনকে পৃথক করা, করব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন, ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা এবং কর ফাঁকি প্রতিরোধে তদন্ত ক্ষমতা বৃদ্ধি।
সরকারের আশা, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রাজস্ব আহরণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং কর আদায়ের পরিধি আরও বিস্তৃত হবে। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, শুধু প্রশাসনিক সংস্কারই যথেষ্ট নয়। তাদের মতে, অর্থনীতির সামগ্রিক গতিশীলতা বাড়ানো, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাও রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য জরুরি শর্ত।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগে ধীরগতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি খাতের অনিশ্চয়তা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করছে বলে তারা উল্লেখ করেন। এসব কারণে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর কৌশল নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘একটা নতুন মডেলের দিকে যাওয়া হয়েছে। বিনিয়োগ থেকে উৎপাদন, উৎপাদন থেকে কর্মসংস্থান, আর কর্মসংস্থান থেকে করের হার না বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ বৃদ্ধি করা।’

