ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত প্রসারের ফলে বিশ্বজুড়ে সৃজনশীল বা ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি এখন গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশও গত এক দশকে এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক, ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্ম, গেমিং, ডিজিটাল বিপণন, অ্যানিমেশন, গ্রাফিক ডিজাইন এবং নানা ধরনের ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে দেশের লাখো তরুণ-তরুণী নতুন কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ তৈরি করেছেন। তবে এতদিন এই খাতকে আলাদা অর্থনৈতিক কাঠামো হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।
এবার ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রথমবারের মতো সৃজনশীল অর্থনীতিকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দেশের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাক, কৃষি ও প্রবাসী আয়কে বিবেচনা করা হলেও এবার সরকার নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছে কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ফ্রিল্যান্সার, স্টার্টআপ, সাংস্কৃতিক শিল্প, কারুশিল্প, পর্যটন, চলচ্চিত্র, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং ক্রীড়া খাতকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলার দিকে। সরকারের লক্ষ্য শুধু সংস্কৃতি বা বিনোদনের বিকাশ নয়; বরং সৃজনশীলতাকে অর্থনৈতিক উৎপাদন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং রপ্তানির নতুন উৎসে পরিণত করা।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের সেবার ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি, বিদেশি সেবা আমদানির ক্ষেত্রে ভ্যাট ছাড় এবং অফিস বা স্থাপনা ভাড়ায় ভ্যাট ছাড় ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বহাল রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সৃজনশীল অর্থনীতির অবদান জিডিপির ১ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। পাশাপাশি নতুন করে পাঁচ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য প্রাথমিকভাবে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রথমবারের মতো ক্রীড়াকে আলাদা অর্থনৈতিক খাত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আগামী বাজেটে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু বরাদ্দ ঘোষণা যথেষ্ট নয়। বাস্তবায়ন কাঠামো, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, বেসরকারি বিনিয়োগ, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক বিপণন এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা গেলে এ খাত প্রত্যাশিত সফলতা অর্জন করতে পারবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বাজেটে সৃজনশীল অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা দেশের অর্থনৈতিক চিন্তায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ফ্রিল্যান্সার, কারুশিল্পী, শিল্পী, চলচ্চিত্র নির্মাতা, ক্রীড়াবিদ, ডিজাইনার ও তরুণ উদ্যোক্তাদের একই কাঠামোর আওতায় আনার প্রচেষ্টা আগে এত বিস্তৃতভাবে দেখা যায়নি। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সৃজনশীলতা শুধু সংস্কৃতির সীমায় না থেকে কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয়, পর্যটন, প্রযুক্তি এবং জাতীয় ব্র্যান্ড গঠনের অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে টেলিযোগাযোগ খাতে মোট করের চাপ প্রায় ৫০ শতাংশ এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রায় ২৫ শতাংশ, যা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় বেশি। এই বাস্তবতায় মোবাইল সিমের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকার কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে আগামী অর্থবছরে সরকারের প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার রাজস্ব কমতে পারে। তবে মোবাইল সেবার ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকার মনে করছে, সৃজনশীল খাত দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয়েছে। অথচ এটি মানবসম্পদ উন্নয়ন, জাতীয় ব্র্যান্ডিং এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির বড় সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। এ কারণে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের কাজ চলছে। লক্ষ্য হলো সৃজনশীল শিল্পকে অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত করা এবং এটিকে উৎপাদনশীল খাতে রূপ দেওয়া।
সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে সবচেয়ে বড় উদ্যোগ হিসেবে সারাদেশে ‘ক্রিয়েটিভ হাব’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব হাবে থাকবে সাংস্কৃতিক মঞ্চ, বইয়ের দোকান ও পাঠাগার, সিনেমা হল, ছোট ক্যাফেটেরিয়া, স্থানীয় পণ্যের প্রদর্শনী ও বিপণন কেন্দ্র এবং উদ্যোক্তাদের কাজের জায়গা।
ঢাকার পূর্বাচলে ১৬০ একর জমির ওপর পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারিত্বে একটি কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক মানের ক্রিয়েটিভ হাব স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। পাশাপাশি কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও এবং বিসিকের অব্যবহৃত জমিতেও এমন কেন্দ্র গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। জেলা, উপজেলা, শিশু একাডেমি এবং শিল্পকলা একাডেমি পর্যায়েও এসব কেন্দ্র বিস্তারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতাকে একীভূত করতে ইতোমধ্যে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উদ্ভাবন কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজেও এই উদ্যোগ সম্প্রসারণ করা হবে। এতে শিক্ষার্থীদের ধারণা বাস্তব ব্যবসায় রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশের ঐতিহ্যবাহী পণ্যকে সামনে আনতে ‘এক গ্রাম এক পণ্য’ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এতে তাঁতশিল্প, মৃৎশিল্প, বুনন শিল্প, শীতলপাটি, শতরঞ্জি, কাঠের খেলনা, হাতে তৈরি গয়না এবং টেরাকোটা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব পণ্যের মান ও নকশা উন্নয়নে দেশীয় ডিজাইনারদের নিয়ে একটি জাতীয় ডিজাইনার পুল গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি বিসিকের ডিজাইন কেন্দ্রকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হবে।
সৃজনশীল অর্থনীতির অংশ হিসেবে সাংস্কৃতিক পর্যটনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা পুনরুদ্ধার করে আন্তর্জাতিক উৎসব আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে কয়েকটি পাইলট প্রকল্প চালু করা হবে। পাশাপাশি মাসভিত্তিক ও থিমভিত্তিক জাতীয় উৎসব ক্যালেন্ডার তৈরি করা হবে। এতে পিঠা উৎসব, বাউল উৎসব, জামাই মেলা, নদী ও সভ্যতাভিত্তিক উৎসব অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
পর্যটন শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। হসপিটালিটি খাতে মানদণ্ড নির্ধারণ, রান্না শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সনদ ব্যবস্থা এবং জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া দেশীয় সৃজনশীল পণ্য ও কনটেন্টকে বিশ্ববাজারে পরিচিত করতে “ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ” নামে একটি জাতীয় ব্র্যান্ড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ, সাংস্কৃতিক পণ্যের বিপণন, দেশের ইতিবাচক পরিচিতি তৈরি এবং রপ্তানি বৃদ্ধি করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে চলচ্চিত্র শিল্প আধুনিকায়ন এবং ওভার দ্য টপ প্ল্যাটফর্মের জন্য আন্তর্জাতিক মানের স্টুডিও গড়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
প্রথমবারের মতো ক্রীড়াকে শুধু বিনোদন নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এ খাতে খেলাধুলা, মিডিয়া, পর্যটন ও ক্রীড়া ব্যবসার সমন্বিত বিকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। ৬৪ জেলায় স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ, ক্রীড়াবিদদের ভাতা প্রদান, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং স্পোর্টস ডিপ্লোম্যাসি শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কর্মসূচির আওতায় ইতোমধ্যে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬২২ জন কিশোর-কিশোরী নিবন্ধিত হয়েছে। এ খাতে আগামী অর্থবছরে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

