বাংলাদেশে ডিজিটাল অর্থ লেনদেন দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। নগদ টাকা বহনের ঝামেলা এড়াতে এখন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ডিজিটাল লেনদেনের দিকে ঝুঁকছে। তবে এই অগ্রগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রতারণার ঘটনাও। নতুন নতুন কৌশলে প্রতারক চক্র মানুষের সঞ্চিত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। আর এসব অর্থ ফেরত পাওয়ার হার খুবই কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে মোবাইল আর্থিক সেবা, চেক ও কার্ডভিত্তিক লেনদেনে মোট ৮১ হাজার ৪২৩টি প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রতারকরা হাতিয়ে নিয়েছে ৯২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৮২ কোটি ৭২ লাখ টাকা এখনো উদ্ধার হয়নি। অর্থ পুনরুদ্ধারের হার মাত্র ১০ দশমিক ৭ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিজিটাল লেনদেন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ পেমেন্ট ব্যবস্থা, প্রতারণা প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি কাঠামো আরও শক্তিশালী করা জরুরি। আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ও গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখতে কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
দীর্ঘদিন ধরে মোবাইল আর্থিক সেবা ব্যবহার করছেন গণমাধ্যমকর্মী জয়নাল আবেদীন। সম্প্রতি তিনি এক ধরনের নতুন প্রতারণার শিকার হন। তার মোবাইলে একটি ফোন আসে। কলকারী নিজেকে বিকাশ প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তা পরিচয় দেন। কথোপকথনের এক পর্যায়ে তার মোবাইলে একটি একবার ব্যবহারযোগ্য পাসওয়ার্ড পাঠানো হয়। এরপর প্রতারকরা তাকে বলে, পাসওয়ার্ডের সঙ্গে তারা যে সংখ্যা দিয়েছে তার বিয়োগফল জানাতে। সেই সময় মোবাইলটি তার স্ত্রীর কাছে থাকায় তিনি বিষয়টি সন্দেহ করেননি।
সহজ বিশ্বাসে তিনি প্রতারকদের দেওয়া নির্দেশ অনুযায়ী হিসাব করে ফল জানিয়ে দেন। এই তথ্য ব্যবহার করে প্রতারকরা তার পাসওয়ার্ড বের করে নেয় এবং মুহূর্তেই তার বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে সব টাকা তুলে নেয়। ভুক্তভোগী জয়নাল আবেদীন জাগো নিউজকে বলেন, তিনি আগে কখনো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি। তার স্ত্রীও প্রতারণার কৌশল বুঝতে না পেরে তথ্য দিয়ে দেন। এরপরই পুরো অর্থ খোয়া যায়।
চেক জালিয়াতির মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের গাংনী উপজেলার জোড়পুকুরিয়া শাখার গ্রাহক বকুল হোসেনের হিসাব থেকে ১২ লাখ ২৮ হাজার টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগে ব্যাংকের এক কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার কথাও বলা হয়েছে। গ্রাহক নিজে উপস্থিত না থাকলেও তার হিসাব থেকে পুরো অর্থ তুলে নেওয়া হয়। পরে বিষয়টি প্রধান কার্যালয়ে জানালে তদন্ত শেষে তার অর্থ সমন্বয় করা হয়। সোনালী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চেক জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে এবং গ্রাহকের অর্থ সমন্বয় করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মোট প্রতারণার প্রায় ৮৮ শতাংশই মোবাইল আর্থিক সেবা খাতে ঘটেছে। ২০২৫ সালে এই খাতে ৮১ কোটি ৩২ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এর মধ্যে ৭৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা উদ্ধার হয়নি। অর্থ পুনরুদ্ধারের হার মাত্র ৮ দশমিক ৭ শতাংশ।
বছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রতারণার ঘটনা ছিল ১৬ হাজার ২৩০টি। দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৬২৩টিতে। পরে বছরের শেষ দিকে কিছুটা কমে আসে। বিশ্লেষণে বলা হয়, প্রতারকরা খুব দ্রুত একাধিক হিসাব ও ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহার করে অর্থ সরিয়ে নেয়। ফলে ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই অর্থ উদ্ধার কঠিন হয়ে পড়ে।
২০২৫ সালে কার্ডভিত্তিক লেনদেনে ৩ হাজার ৭৪০টি প্রতারণার ঘটনায় প্রায় ২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। পরে এই খাতে প্রতারণা কমে আসে। অন্যদিকে চেক জালিয়াতির ৩০টি ঘটনায় প্রায় ৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ হয়। তবে এই খাতে অর্থ পুনরুদ্ধারের হার তুলনামূলকভাবে বেশি, প্রায় ৮১ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ খাতে তদারকি আরও জোরদার করছে এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতারণা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে তাদের সুনাম ও গ্রাহকের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট এবং অপরাধ তদন্ত বিভাগ সমন্বিতভাবে আর্থিক অপরাধ দমনে কাজ করছে।
ব্যাংক খাত গবেষক এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, ডিজিটাল লেনদেন বাড়লেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল হলে ঝুঁকি বাড়বে। প্রতারকরা দ্রুত অর্থ সরিয়ে নেওয়ায় উদ্ধার কঠিন হয়ে যায়। তাই গ্রাহক পরিচিতি যাচাই, ভুয়া সিম ও ভুয়া হিসাব শনাক্ত এবং তথ্য আদান-প্রদান আরও শক্তিশালী করা দরকার। তিনি আরও বলেন, গ্রাহকদের সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। অনেক প্রতারণা একবার ব্যবহারযোগ্য পাসওয়ার্ড বা ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করার কারণে ঘটে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ ঝুঁকির লেনদেনে নির্দিষ্ট সময় বিরতি রাখা, কেন্দ্রীয় প্রতারণা তথ্যভান্ডার তৈরি এবং একাধিক সেবা প্রদানকারীর মধ্যে তাৎক্ষণিক লেনদেন স্থগিতের ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। চেক লেনদেনে উন্নত যাচাই প্রযুক্তি ও নিয়মিত নিরীক্ষা জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে। কার্ড লেনদেনে উন্নত ঝুঁকি নির্ণয় ব্যবস্থা এবং অনলাইন লেনদেনে কঠোর নজরদারির কথা বলা হয়েছে।
ডিজিটাল লেনদেন বাড়ার ফলে যেমন সুবিধা বাড়ছে, তেমনি প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়ছে। বিশেষ করে মোবাইল আর্থিক সেবা খাতে অর্থ উদ্ধার হার কম হওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তি, নজরদারি ও সচেতনতা—এই তিনটি ক্ষেত্রেই সমন্বিত ব্যবস্থা না নিলে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে।

