বিশ্বজুড়ে আজ (২১ জুন) পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব মোটরসাইকেল দিবস’। এই বৈশ্বিক উদযাপনের ঠিক আগমুহূর্তে বাংলাদেশের মোটরসাইকেল খাতে দেখা দিয়েছে ইতিবাচক পরিবর্তন। ডলার সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর বৃদ্ধি এবং সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটের চাপ সামলে দেশের বাজার আবারও প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে শুরু করেছে।
বহুদিন ধরে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপের কারণে যে মন্দা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে মোটরসাইকেল বিক্রি এখন আবার বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরেছে। একই সঙ্গে নতুন মডেলের মোটরসাইকেল বাজারে আসায় শোরুমগুলোতে ক্রেতাদের উপস্থিতিও বেড়েছে। দীর্ঘদিন কেনাকাটা স্থগিত রাখা ক্রেতাদের জমে থাকা চাহিদাও এখন বাজারে প্রভাব ফেলছে।
মোটরসাইকেল কোম্পানিগুলোর তথ্যমতে, গত মে মাসে খুচরা বা শোরুম পর্যায়ে দেশে প্রায় ৫২ হাজার ৫০০টি মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে। আগের বছরের মে মাসে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৪১ হাজার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে একক মাসে বিক্রি বেড়েছে প্রায় ২৯ শতাংশ।
ব্র্যান্ডভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে রয়েছে জাপানি ও ভারতীয় ব্র্যান্ডগুলো। ইয়ামাহা মে মাসে বিক্রি করেছে ১২ হাজার ৯০০টির বেশি মোটরসাইকেল, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৭ শতাংশ বেশি। সুজুকির বিক্রি বেড়ে সাড়ে ১২ হাজারেরও বেশি হয়েছে, প্রবৃদ্ধি ৩৪ শতাংশ। হোন্ডা বিক্রি করেছে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার, যা ২৪ শতাংশ বেশি।
ভারতীয় ব্র্যান্ড বাজাজ বিক্রি করেছে সাড়ে ৭ হাজার মোটরসাইকেল, প্রবৃদ্ধি ৩৫ শতাংশ। টিভিএসের বিক্রি বেড়ে প্রায় ১ হাজার ২০০টি হয়েছে, যা ৬২ শতাংশ বৃদ্ধি। এছাড়া হিরো মোটোকর্প নিলয় বাংলাদেশের হিরো ব্র্যান্ডে বিক্রি হয়েছে ৭ হাজার ৯৮৮টি মোটরসাইকেল, প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ। সিএফমটোসহ অন্যান্য ব্র্যান্ডেও ৮ থেকে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
শুধু মে মাস নয়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসেও মোটরসাইকেল বাজারে ঘুরে দাঁড়ানোর চিত্র স্পষ্ট। গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত খুচরা পর্যায়ে দেশে মোট ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৩০০টির বেশি মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে বিক্রি ছিল প্রায় ৩ লাখ ৭২ হাজার। অর্থাৎ এ সময়ে বিক্রি বেড়েছে ৪ শতাংশ।
আগামী দিনের বাজার পরিস্থিতি বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো কারখানা থেকে ডিলার বা শোরুমে সরবরাহের পরিমাণ। তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ মাসে কোম্পানিগুলো ডিলার পর্যায়ে ৪ লাখ ১৪ হাজারের বেশি মোটরসাইকেল সরবরাহ করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩ শতাংশ বেশি। ব্যবসায়ীদের মতে, এই বৃদ্ধি আগামী মাসগুলোতেও বাজার ইতিবাচক থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সংকট পেরিয়ে ঘুরে দাঁড়ানো:
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অটোমোবাইল খাত বড় ধরনের চাপের মধ্যে ছিল। ২০২২ সালে দেশে প্রায় ৬ লাখ মোটরসাইকেল বিক্রি হলেও ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ৩ লাখ ৯০ হাজারে।
ডলার সংকট, ডলারের দাম ৮৬ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকার ওপরে ওঠা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং উৎপাদনকারীদের করপোরেট কর দ্বিগুণ হওয়ার কারণে এই পতন ঘটে। পরে ২০২৬ সালের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও দেশের জ্বালানি তেলের রেশনিংও বিক্রিতে প্রভাব ফেলে। ঈদের মৌসুমে বিক্রি কিছুটা কমে গেলেও পরে বাজার আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে।
এসিআই মোটরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুব্রত রঞ্জন দাস বলেন, বাজারে সামগ্রিকভাবে প্রবৃদ্ধি থাকলেও তা খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়। তিনি জানান, ১৫০ সিসি বা এর বেশি ক্ষমতার মোটরসাইকেল কেনার ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তের প্রভাব কতটা পড়বে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে তার মতে, সরকারের লক্ষ্য মূলত রাজস্ব বৃদ্ধি, এতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে বলে তিনি মনে করেন না।
বর্তমানে দেশের মোটরসাইকেল বাজারে বিক্রি হওয়া যানবাহনের প্রায় ৯৫ শতাংশই স্থানীয়ভাবে তৈরি বা সংযোজিত। দেশে এই খাতে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থানও তৈরি হয়েছে। সরকার এই খাত থেকে বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পেয়ে থাকে।
ব্যবসায়ীরা মনে করেন, এই ইতিবাচক ধারাকে দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই করতে হলে নীতিগত ধারাবাহিকতা জরুরি। ঘন ঘন কর পরিবর্তন বা হঠাৎ কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে তা বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি সাধারণ ক্রেতাদেরও নিরুৎসাহিত করে। তাদের মতে, বাজার সম্প্রসারণে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল শুল্কনীতি প্রয়োজন।

