২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কাঁচা কাজুবাদামের ওপর শুল্ক কাঠামো পরিবর্তনের ফলে দেশের কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাত শিল্পে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, নতুন শুল্ক ব্যবস্থায় স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাত পণ্যের তুলনায় আমদানিকৃত প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম অনেক সস্তা হয়ে যাবে। এতে দেশীয় কারখানাগুলো প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, প্রস্তাবিত বাজেটে এমন একটি উল্টো শুল্ক কাঠামো তৈরি হয়েছে, যেখানে স্থানীয় কারখানার কাঁচামাল কাঁচা কাজুবাদামের ওপর কর বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় ভারত থেকে প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম আমদানিতে শুল্ক সুবিধা আগের মতোই বহাল রাখা হয়েছে। ফলে স্থানীয় শিল্প একদিকে কাঁচামাল আমদানিতে বেশি কর দেবে, অন্যদিকে কম দামে বিদেশি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে। খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, এই নীতির কারণে দেশের প্রায় ২০টি প্রক্রিয়াজাত কারখানা বন্ধের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। পাশাপাশি শত শত কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগও অনিশ্চয়তায় পড়বে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সংকট মূলত দুই ধরনের পণ্যকে ঘিরে তৈরি হয়েছে। একদিকে খোসাসহ কাঁচা কাজুবাদাম, যা কারখানার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে খোসা ছাড়ানো প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম, যা সরাসরি বাজারে বিক্রি হয়। তাদের তথ্য অনুযায়ী, এক কেজি প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম উৎপাদনে প্রায় পাঁচ কেজি কাঁচা কাজুবাদাম প্রয়োজন হয়।
প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, কাঁচা কাজুবাদামের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক ও ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর আরোপ করা হয়েছে। এতে মোট করের হার বর্তমান ১৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৪০ দশমিক ৩৮ শতাংশে দাঁড়াবে। অন্যদিকে ভারত থেকে আমদানিকৃত প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় শুল্ক সুবিধা পাওয়ায় তুলনামূলকভাবে সস্তা থাকবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে জমা দেওয়া উদ্যোক্তাদের হিসাবে বলা হয়েছে, নতুন শুল্ক কাঠামো কার্যকর হলে দেশে উৎপাদিত প্রতি কেজি প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের খরচ দাঁড়াবে প্রায় ১ হাজার ৭২৫ টাকা। অন্যদিকে ভারত থেকে আমদানিকৃত প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের বাজারদর হবে প্রতি কেজি প্রায় ১ হাজার ২৮২ টাকা। ফলে দেশীয় ও আমদানিকৃত পণ্যের মধ্যে কেজিপ্রতি ব্যবধান দাঁড়াবে প্রায় ৪৭১ টাকা। উদ্যোক্তাদের মতে, এই বড় ব্যবধানের কারণে দেশীয় উৎপাদন কার্যত অলাভজনক হয়ে পড়বে।
গ্রিন হার্ভেস্ট ফ্রেশ প্রডিউস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রবিউল ইসলাম আজাদ বলেন, শুল্ক কাঠামো পরিবর্তন না হলে কারখানা বন্ধ করা ছাড়া উপায় থাকবে না। কারণ আমদানিকৃত পণ্য স্থানীয় উৎপাদন খরচের চেয়েও অনেক কম দামে বিক্রি করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, চাহিদার বড় অংশ পূরণে বাংলাদেশকে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে কাঁচা কাজুবাদাম আমদানি করতে হয়। এসব দেশ দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় পূর্ণ শুল্ক দিতে হয়। অথচ ভারত থেকে প্রক্রিয়াজাত পণ্য আনার ক্ষেত্রে শুল্ক সুবিধা বহাল রয়েছে।
রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ২ হাজার টন কাঁচা কাজুবাদাম উৎপাদন হয়, যেখানে চাহিদা ১৫ হাজার টনের বেশি। প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৩ হাজার টন। এর মধ্যে স্থানীয় কারখানাগুলো সরবরাহ করে মাত্র ৮০০ টন। বাকি ২ হাজার ২০০ টন আসে আমদানির মাধ্যমে।
বিএসআরএম গ্রুপের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত বলেন, বিদ্যমান উৎপাদন ক্ষমতা ধরে রাখতে প্রক্রিয়াজাতকারীদের বছরে ৪ হাজার টনের বেশি কাঁচা কাজুবাদাম প্রয়োজন হয়। কিন্তু দেশীয় উৎপাদন তার অর্ধেকেরও কম। তাই আমদানি বাধ্যতামূলক প্রয়োজন।
পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে কাজুবাদাম চাষের সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে প্রায় এক দশক আগে দেশে এই প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে ওঠে। তবে শুরু থেকেই বিদেশি পণ্যের সঙ্গে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের। দেশের প্রথম বাণিজ্যিক কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাত কারখানার উদ্যোক্তা শাকিল আহমেদ তানভীর বলেন, বছরের পর বছর লোকসানের কারণে ২০২২ সালে তার কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। তিনি জানান, আমদানিকৃত প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম অনেক সময় দেশীয় উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে বাজারে বিক্রি হয়।
বর্তমানে বিএসআরএমসহ কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠী এই খাতে বিনিয়োগ করেছে। বিএসআরএম ২০২৩ সালে চট্টগ্রামে কারখানা চালু করে এবং মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা নেয়। অন্যদিকে কাজী ফার্মসও এই খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। তবে উদ্যোক্তারা সতর্ক করে বলছেন, বর্তমান শুল্ক কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলে এসব বিনিয়োগও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তাদের মতে, শুধু কাঁচা কাজুবাদামের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ ভারত থেকে আমদানিতে শুল্ক সুবিধা থাকায় প্রতিযোগিতা অসম থেকে যাবে। এ অবস্থায় তারা বিদেশ থেকে আমদানিকৃত খোসা ছাড়ানো প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফর ক্যাশু প্রসেসরসের সভাপতি মোহাম্মদ আজাদ ইকবাল পাঠান বলেন, শুধুমাত্র কাঁচামালের শুল্ক বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হলে সব দেশের আমদানিতে সমান নিয়ম প্রযোজ্য হবে এবং বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হবে।

