দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুরোপুরি স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সরকারের অন্তত দুই বছর সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে এবং এই অবস্থায় দ্রুত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
আজ রোববার রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত বাজেট সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আখতার হোসেন সম্মানিত অতিথি হিসেবে অংশ নেন।
বিভিন্ন আলোচনায় অংশ নেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি), র্যাপিড, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই), বিজিএমইএ এবং শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।
অর্থনীতির পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা:
অর্থমন্ত্রী বলেন, “আমরা মনে করি দুই বছরের মধ্যে অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থা থেকে স্থিতিশীলতায় যাবে। তৃতীয় বছরে ঘুরে দাঁড়াবে এবং চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে সমৃদ্ধির পথে এগোবে।”
তিনি আরও জানান, দেশের জ্বালানি সংকটই সবচেয়ে বড় সমস্যা। গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে দ্রুত সমাধান সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বাইরে থেকে গ্যাস এনে সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অন্তত ১৮ মাস সময় লাগবে বলে জানান। ২০৪১ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও শক্তিশালী ইন্টারনেট ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই তিন খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ চলছে।
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বাজেট বাস্তবায়নে তিন মাস পরপর অগ্রগতি পর্যালোচনার পরামর্শ দেন। এর জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, আগামী জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ থেকে প্রকল্প পর্যবেক্ষণের জন্য একটি ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড চালু করা হবে। তিনি বলেন, প্রতিটি প্রকল্প দৈনিক ভিত্তিতে নজরদারির আওতায় আনা হবে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বাজেটে বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, পরিচালন ব্যয়ের জন্য কোনো থোক বরাদ্দ রাখা হয়নি, বরাদ্দ কেবল উন্নয়ন খাতেই ব্যবহৃত হচ্ছে। তিনি আরও জানান, বাজেটের নিয়মকানুন সহজ করা হয়েছে এবং তা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হচ্ছে। পাশাপাশি একটি ওয়েবসাইট চালু হবে, যেখানে নাগরিক ও ব্যবসায়ীরা হয়রানি বা নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ জানাতে পারবেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আমদানি করা কাঁচামালের শুল্ক ও কর কমানো হয়েছে। রপ্তানি খাতে বন্ড সুবিধা আরও সহজ করা হয়েছে। এখন যে কোনো খাতের ব্যবসায়ী এই সুবিধা নিতে পারবেন। ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমেও শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আনা যাবে। এমনকি এলসি ছাড়াও আমদানি করা সম্ভব হবে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি জানান, উন্নয়ন প্রকল্পের সময়সীমা ও বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা তৈরি করা হবে।
এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বাজেটকে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অবাস্তব এবং ঋণনির্ভর বলে মন্তব্য করেন। তিনি বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
পিপিআরসির হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সাধারণ মানুষের কাছে ঋণ এখন টিকে থাকার উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষ খাদ্য ও চিকিৎসা খরচ কমাচ্ছে এবং একাধিক কাজ করছে। তিনি অর্থনীতির তিনটি প্রধান সংকট চিহ্নিত করেন—কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং শিক্ষার মান।
র্যাপিডের চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক বলেন, দেশের মাত্র এক শতাংশ মানুষ মোট সম্পদের প্রায় অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করছে। এটি বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি করেছে। তিনি সম্পদ কর ও উত্তরাধিকার কর চালুর প্রস্তাব দেন।
বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী বলেন, জ্বালানি সংকটে শিল্প খাত বড় চাপের মধ্যে রয়েছে। উচ্চ সুদের হারও ব্যবসার জন্য সমস্যা তৈরি করছে। তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষ বলেন, বাজেটে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে কোনো পরিবর্তন আসেনি এবং রেশন ব্যবস্থার দাবি এখনো উপেক্ষিত।

