বর্তমান সরকারের সামনে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের পথে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় তিনটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং জ্বালানি খাত। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, এসব সংকট কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা না গেলে বাজেট বাস্তবায়ন যেমন বাধাগ্রস্ত হবে, তেমনি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি দীর্ঘ সময় ধরে শ্লথ থাকতে পারে।
গতকাল রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত বাজেট সংলাপে অংশ নিয়ে বক্তারা এ আশঙ্কার কথা তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতিকে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় পেয়েছে। তিনি জানান, সাধারণত একটি বাজেট প্রস্তুত করতে প্রায় ছয় মাস সময় প্রয়োজন হলেও এবার সরকার হাতে পেয়েছে মাত্র দেড় মাস।
মন্ত্রী বলেন, সীমিত সময়ের কারণে বাজেটকে পুরোপুরি সুষম বলা যাবে না। তবে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁর মতে, এই বাজেটের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানো সম্ভব হবে না। অর্থনীতিকে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে আগামী ১ জুলাই থেকে একটি ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড চালুর কথাও জানান তিনি। একই সঙ্গে রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য আনার লক্ষ্যে সব খাতে বন্ড লাইসেন্স সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাঠামো সংস্কার করে নীতিনির্ধারণী বিভাগকে আলাদা করার পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে।
জ্বালানি সংকটকে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে উল্লেখ করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সমস্যা রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়। বিদেশ থেকে গ্যাস এনে সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত করতে কমপক্ষে ১৮ মাস সময় লাগবে। তিনি জানান, ২০৪১ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গঠনের লক্ষ্য সামনে রেখে সরকার গ্যাস, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে।
সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে প্রতি তিন মাস অন্তর অগ্রগতি মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। তাঁর মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও স্থবিরতা দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে প্রতিটি প্রকল্পের অগ্রগতি দৈনিক ভিত্তিতে পর্যবেক্ষণ করা হবে। পাশাপাশি একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যেখানে নাগরিক ও ব্যবসায়ীরা নীতিগত জটিলতা কিংবা হয়রানির অভিযোগ জানাতে পারবেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের মতে, প্রস্তাবিত বাজেট দেশের বাস্তব অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি বলেন, ঘাটতি ও ঋণনির্ভর এই বাজেট ভবিষ্যতে অর্থনীতির ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশে ঋণ এখন উৎপাদনশীল বিনিয়োগের বদলে টিকে থাকার হাতিয়ার হয়ে উঠছে। তিনি জানান, নিম্ন আয়ের মানুষ ক্রমবর্ধমান চাপের কারণে খাদ্য ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছে। তাঁর মতে, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং শিক্ষার মান—এই তিন খাতে সংকট বর্তমানে সবচেয়ে প্রকট।
র্যাপিড চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাক বলেন, দেশে সম্পদ বৈষম্য উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। তাঁর গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ মানুষের হাতে প্রায় অর্ধেক সম্পদ কেন্দ্রীভূত রয়েছে। বৈষম্য কমাতে তিনি সম্পদ কর ও উত্তরাধিকার কর চালুর পরামর্শ দেন।
বিজিএমইএ এবং বিভিন্ন শিল্প সংগঠনের নেতারা বলেন, জ্বালানি সংকট ও উচ্চ সুদহার বর্তমানে শিল্প খাতের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের মতে, নতুন প্রবৃদ্ধির চেয়ে বিদ্যমান শিল্পকারখানাগুলোকে টিকিয়ে রাখাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষ বলেন, শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে বাজেটে উল্লেখযোগ্য কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। দীর্ঘদিন ধরে রেশন সুবিধার দাবি জানানো হলেও তা বাস্তবায়িত না হওয়ায় শ্রমিকদের কষ্ট আরও বেড়েছে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে না। তিনি উল্লেখ করেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চারটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ স্থির রয়েছে অথবা কমেছে, যা লক্ষ্য অর্জনের পথে বড় প্রতিবন্ধকতা হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও খাদ্যপণ্যের দাম ও জ্বালানি সংকট নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

