ঢাকার হাজারীবাগ থেকে চামড়া শিল্প সরিয়ে পরিবেশসম্মত স্থানে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল ২০০৩ সালে। লক্ষ্য ছিল দ্রুত বাস্তবায়ন। কিন্তু ২৩ বছর পার হলেও সেই প্রকল্প এখনো পুরোপুরি পূর্ণতা পায়নি।
প্রাথমিক পরিকল্পনায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা ১৫৫টি চামড়া প্রক্রিয়াকরণ কারখানা ২০০৫ সালের মধ্যে স্থানান্তরের কথা ছিল। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। প্রকল্পটি ১০ বার সংশোধন করে শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালের জুনে সম্পন্ন দেখানো হয়। এতে সময় লেগেছে প্রায় সাড়ে ১৫ বছর। প্রকল্পের ব্যয়ও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৭৬ কোটি টাকা। পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৩৮ কোটি টাকায়। বৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৪৩৪ শতাংশ। সময়ও বেড়েছে ৬১৬ শতাংশ।
সাভার ও কেরানীগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৬০০ বিঘা জমিতে গড়ে তোলা হয় চামড়া শিল্পনগরী। এতে অন্তর্ভুক্ত হয় কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার, প্রশাসনিক ভবন, ফায়ার স্টেশন, পুলিশ স্টেশন, সড়ক, ড্রেনেজ, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহসহ নানা অবকাঠামো।
জমি অধিগ্রহণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকা। জমি উন্নয়নে ৩২ কোটি, প্রশাসনিক ভবনে ৮ কোটি ৩৩ লাখ, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারে প্রায় ৪৭৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়। এছাড়া পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ লাইন, সড়ক বাতি, ডাম্পিং ইয়ার্ড, নলকূপ ও সৌর প্যানেলসহ নানা অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। তবে এত ব্যয়ের পরও প্রকল্পটি পূর্ণ কার্যকারিতা অর্জন করতে পারেনি। নির্মিত কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার এখনো প্রয়োজন অনুযায়ী কার্যকরভাবে চালু হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হেমায়েতপুরের ট্যানারি এলাকায় শতভাগ অবকাঠামো তৈরি হলেও প্রত্যাশিত মানে কার্যক্রম চলছে না। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবও রয়েছে। শোধনাগারের ধারণক্ষমতা দৈনিক ২৫ হাজার ঘনমিটার, যা বর্তমান বর্জ্য পানির তুলনায় কম। ফলে পুরো বর্জ্য পরিশোধন সম্ভব হচ্ছে না। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও কার্যকর হয়নি। অনেক বর্জ্য খোলা জায়গায় জমা থাকায় পরিবেশ দূষণ বাড়ছে। বর্জ্য ধলেশ্বরী নদীতে পড়ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিল্পনগরীতে ১৬২টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হলেও সবগুলোতে উৎপাদন শুরু হয়নি। প্রকল্পে কেনা যানবাহনগুলোর মধ্যে জিপ ও মাইক্রোবাস এখনো পরিবহন পুলে জমা হয়নি। সাবেক প্রকল্প পরিচালক একটি জিপ ব্যবহার করছেন এবং একটি মাইক্রোবাস অন্য কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। পাঁচ বছর পরও ৪৭টি অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি হয়নি।
পরিবেশ সনদ না পাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে শোধনাগারের সীমিত সক্ষমতা ও অপারেশনাল দুর্বলতাকে উল্লেখ করা হয়েছে। অনেক কারখানায় নিজস্ব বর্জ্য পরিশোধনাগার নেই। ফলে পরিবেশগত মান বজায় রাখা যাচ্ছে না। লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের সনদের জন্য যে মানদণ্ড প্রয়োজন, যেমন কেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড, বায়োলজিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড ও টোটাল ডিজলভড সলিডস—সেগুলোও পূরণ হচ্ছে না।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সাভারে স্থানান্তরের পর কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও রপ্তানি সক্ষমতা কমেছে। এখনো ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু হয়নি। ফলে বিদেশি ক্রেতা ও উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছেন না।
শ্রমিকদের মধ্যে ৪৯ শতাংশ জানিয়েছেন কর্মপরিবেশ কিছুটা উন্নত হয়েছে। ৭০ শতাংশ জানিয়েছেন পরিচ্ছন্নতা বেড়েছে এবং দুর্ঘটনা কমেছে। তবে ২৮ শতাংশ শ্রমিক এখনও নিরাপত্তা সরঞ্জাম পান না। ৯৪ শতাংশ জানিয়েছেন কোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা চিকিৎসা সুবিধা নেই। ৪০ শতাংশ শ্রমিক ক্ষতিপূরণ পান না বলেও অভিযোগ করেছেন। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্পটি দীর্ঘ সময়েও কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি। ধলেশ্বরী নদী দূষণ বাড়ছে। এলডব্লিউজির সনদ না পাওয়ায় রপ্তানি বাজারেও প্রভাব পড়ছে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দীর্ঘ সময়েও প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না। পরিবেশগত দুর্বলতার কারণে সনদ পাওয়া যাচ্ছে না, রপ্তানি কমছে। তিনি ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্পে দ্রুত বাস্তবায়ন ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।

