সম্প্রতি গবেষণা তথ্য সংগ্রহের অংশ হিসেবে সরকারি প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো পরিদর্শনের সুযোগ হয়। একাধিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নতুন কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত খেলাভিত্তিক শিক্ষার ধারণা অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবায়িত হচ্ছে।
শ্রেণিকক্ষে বিভিন্ন ধরনের খেলার কর্নার রয়েছে। শিশুদের জন্য খেলনা ও শিক্ষাসামগ্রীর ব্যবস্থাও আছে। টেকসই খেলনা ও উপকরণ থাকলে শিশুদের খেলার মাধ্যমে শেখার সুযোগ সারা বছর ধরে বজায় রাখা সম্ভব হয়। কোথাও এই ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজ করছে, আবার কোথাও সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে দুটি বড় সমস্যা স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে।
প্রথম সমস্যা হলো শিক্ষার্থী উপস্থিতির অনিয়ম। একটি বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ছিল ৯০ জন, কিন্তু উপস্থিত ছিল প্রায় ৪০ জন। পরিদর্শিত তিনটি বিদ্যালয়ের প্রতিটিতেই মোট শিক্ষার্থীর প্রায় অর্ধেক বা তারও বেশি অনুপস্থিত ছিল। শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বৃষ্টি, শীত, অতিরিক্ত গরম, ছুটি কিংবা গ্রামে বেড়াতে যাওয়ার মতো নানা কারণে শিশুদের অনুপস্থিতি দীর্ঘ হয়। অনেক শিশু আবার বছরের মাঝামাঝি সময়ে ভর্তি হয়।
এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের শেখার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা শিক্ষকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। একই শ্রেণিতে নতুন, নিয়মিত ও দীর্ঘদিন অনুপস্থিত শিশু একসঙ্গে থাকায় পাঠ পরিকল্পনা ও শেখানোর গতি ঠিক রাখা যায় না। এর প্রভাব পড়ে শিক্ষককের কর্মউদ্দীপনা ও আনন্দদায়ক পাঠদানের ওপরও।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের পরিচিত সমস্যা—সীমিত সুযোগ-সুবিধা, কর্মপরিবেশ ও পেশাগত স্বীকৃতির ঘাটতি। প্রতি বছর জাতীয় বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায়। কিন্তু দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক গড়ার দায়িত্ব যাদের কাঁধে, সেই শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন, প্রণোদনা ও কর্মপরিবেশ কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে—এ প্রশ্ন থেকেই যায়।
আন্তর্জাতিকভাবে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের মানদণ্ড হিসেবে ইউনেসকোর সুপারিশ বহুলভাবে ব্যবহৃত। ইউনেসকোর মতে, একটি দেশের শিক্ষা খাতে ব্যয় হওয়া উচিত মোট জাতীয় বাজেটের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বা জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ মোট বাজেটের প্রায় ১২ শতাংশ। জিডিপির অনুপাতেও এই ব্যয় আন্তর্জাতিক সুপারিশের তুলনায় অনেক কম।
শিশুদের জন্য বাজেট বরাদ্দকে ব্যয় নয়, ভবিষ্যৎ গঠনের বিনিয়োগ হিসেবে দেখা জরুরি। অবকাঠামো উন্নয়ন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই অবকাঠামো ব্যবহার করবে যে মানুষ, তাকে গড়ে তোলার কাজ আরও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দের পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ—এই বরাদ্দের কতটা প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় ব্যয় হচ্ছে। গবেষণা বলছে, শিক্ষাজীবনের প্রথম বছরগুলোতেই সবচেয়ে বেশি শেখা ও মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, একটি শিশুর মস্তিষ্কের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ বিকাশ জীবনের প্রথম কয়েক বছরেই সম্পন্ন হয়। এই সময়ে যথাযথ শিক্ষা, পুষ্টি, সুরক্ষা ও পরিচর্যা না পেলে পরবর্তী জীবনে সেই ঘাটতি পূরণ কঠিন হয়ে পড়ে।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জেমস হেকম্যানের মতে, জীবনের অন্য যেকোনো পর্যায়ের তুলনায় প্রারম্ভিক শৈশবে বিনিয়োগের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিফলন সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, শিশুর বিকাশ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও মানসম্মত পরিবেশে বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্র—সব পক্ষকেই লাভবান করে। বিশ্বব্যাংকও বারবার সতর্ক করছে, প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে বিনিয়োগ না বাড়ালে ভবিষ্যতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি কঠিন হবে। কারণ এ পর্যায়েই মস্তিষ্কের প্রায় ৯০ শতাংশ বিকাশ সম্পন্ন হয়।
বয়সভিত্তিক মস্তিষ্ক বিকাশের গবেষণায় দেখা যায়, এক বছর বয়সে শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছে যায় এবং পাঁচ বছর বয়সে তা প্রায় ৯০ থেকে ৯২ শতাংশে উন্নীত হয়। তাই শৈশবের শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের শ্রমশক্তি, উদ্যোক্তা, গবেষক, শিক্ষক, চিকিৎসক ও নীতিনির্ধারক।
দ্বিতীয় বড় সমস্যা হলো শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ। শিক্ষকরা কি শিশু বিকাশ বিষয়ে পর্যাপ্ত ও হালনাগাদ প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন—এ প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের ভাষা বিকাশ কীভাবে ঘটে, খেলাভিত্তিক শিক্ষা কীভাবে পরিচালনা করতে হয়, শিক্ষাসামগ্রী কীভাবে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়—এসব বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, ডিজিটাল উপকরণ ব্যবহার ও আধুনিক শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনাও জরুরি। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অনেক শিক্ষক আন্তরিক হলেও খেলাভিত্তিক বা শিশু-কেন্দ্রিক শিক্ষা বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত সহায়তা পান না। নতুন কারিকুলামের সফল বাস্তবায়ন অনেকাংশে শিক্ষকের দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস ও সৃজনশীলতার ওপর নির্ভরশীল।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শ্রেণিকক্ষের উপকরণ ও শিশু কর্নারের টেকসই ব্যবস্থা। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাবর্ষের শুরুতে দেওয়া উপকরণ কয়েক মাসের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যায় বা অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে খেলাভিত্তিক শিক্ষার উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। এসব উপকরণের রক্ষণাবেক্ষণ, নবায়ন এবং স্থানীয়ভাবে তৈরি উদ্যোগের জন্যও পর্যাপ্ত বাজেট প্রয়োজন।
এছাড়া শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য নিয়মিত শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণ, মেন্টরিং ও কার্যকর প্রণোদনা ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় দেখা যায়, বিদ্যমান সম্পদ দিয়েই ভালো শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা সম্ভব। তবে কাঠামোগত ও পেশাগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক শিক্ষকের মধ্যে কর্মপ্রেরণার ঘাটতি তৈরি হয়। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্মত শিক্ষার কথা বলে। কিন্তু মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে ভিত্তি মজবুত করতে হবে, আর সেই ভিত্তি গড়ে ওঠে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে।
আমরা প্রায়ই প্রাক-প্রাথমিক স্তরকে শুধু শিশু শ্রেণি হিসেবে দেখি কিন্তু বাস্তবে এটি শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি নির্মাণের সময়। এই পর্যায়ে ভাষা, সামাজিকতা, কৌতূহল, সমস্যা সমাধান, আত্মবিশ্বাস ও শেখার আগ্রহ গড়ে ওঠে। শিক্ষা গবেষণায় একটি প্রচলিত ধারণা হলো—বিনিয়োগ যত আগে, ফল তত বেশি। তাই শিশুদের জন্য বাজেট বরাদ্দকে ব্যয় নয়, ভবিষ্যৎ গঠনের বিনিয়োগ হিসেবে দেখা জরুরি। অবকাঠামো যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, সেই অবকাঠামো পরিচালনার মানুষ গড়ার কাজ আরও গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই কাজ শুরু হয় শৈশব থেকেই।
বিভিন্ন দেশের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় বরাদ্দের তুলনায় দেখা যায়, সুইডেনে ১০ থেকে ১২ শতাংশ, নরওয়েতে ৯ থেকে ১১ শতাংশ, ফিনল্যান্ডে ৮ থেকে ১০ শতাংশ, ফ্রান্সে ৮ থেকে ১০ শতাংশ, যুক্তরাজ্যে ৬ থেকে ৮ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়ায় ৫ থেকে ৭ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৫ থেকে ৬ শতাংশ, ভিয়েতনামে ৪ থেকে ৬ শতাংশ, ভারতে ২ থেকে ৪ শতাংশ। আর বাংলাদেশে এই হার ১ শতাংশেরও কম অর্থাৎ প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় বরাদ্দ এখনো অত্যন্ত সীমিত।
জাতির ভবিষ্যৎ যদি সত্যিই অগ্রাধিকার হয়, তবে বাজেট আলোচনায় শিশুদের স্থানও অগ্রাধিকার পেতে হবে। কারণ বাজেট শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, এটি একটি জাতির অগ্রাধিকার নির্ধারণের দলিল।
আমরা যদি উন্নত বাংলাদেশ গড়তে চাই, তবে সেই যাত্রা শুরু করতে হবে শৈশব থেকেই। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, শিশুর বিকাশ ও শিক্ষকদের সক্ষমতায় বিনিয়োগ কোনো ব্যয় নয়—এটি ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ।

